মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তরুণদের নতুন প্লাটফর্ম ককরোচ (তেলাপোকা) জনতা পার্টি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার তদন্ত ও বিচারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান এ আন্দোলন এরই মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তাদের এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্য আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তবে, মাঝপথে এসে আন্দোলনে লক্ষ্য করা যাচ্ছে নতুন মোড়।
গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে নতুন এক বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সেইসঙ্গে রাতেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বিনীত জোশীকে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের বিধান এবং কঠোর শাস্তির প্রস্তাবসহ একটি খসড়া বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
ভিডিওর সঙ্গে দেওয়া পোস্টে মোদি লিখেন, আগামীকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে।
তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই উল্লেখ করে ভিডিও বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি, প্রশ্নফাঁস কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গত আড়াই মাসে সরকার এ ঘটনায় একাধিক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। দায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হতে না দেওয়া। তাই অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে এবং সম্প্রতি ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে।
মোদি আরও বলেন, আমরা এখানেই থেমে থাকছি না। আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের নির্দেশ দিয়েছি। তারা রাতভর কাজ করে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। এতে দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আগামীকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি জানান, মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতামত যুক্ত করে বিলটির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে এবং সংসদের চলতি অধিবেশনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই এটি দ্রুত পাস করানোর চেষ্টা করা হবে।
মোদির এমন প্রতিশ্রুতির পরে ২৭ দিনের মাথায় হাসপাতালের খাটে বসেই অনশন প্রত্যাহার করেছেন ওয়াংচুক। ওই সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি জৈন আংমো। হাসপাতালে গিয়ে ওয়াংচুকের অনশন ভাঙান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংহ। অনশন প্রত্যাহারের পরে ওয়াংচুককে উত্তরীয় পড়িয়ে সম্মান জানান হাসপাতালে উপস্থিত বেশ কয়েকজন।
সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পোস্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পোস্টে সোনম ওয়াংচুকের চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলতে এবং দ্রুত তার পুরোনো স্বাস্থ্য ও ওজন ফিরে পেতে সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি।
শুধু তাই নয়; কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ আমলা বিনীত জোশীকে সরিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নরেশ গাঙ্গোয়ার। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গভীর রাতে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তবে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এখনও আছেন বহাল তবিয়তে। আর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম দাবি তাকে অপসারণ করতে হবে। আর তাই দাবি সম্পূর্ণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনও অটল আছে সিজেপি।
তবে, আন্দোলনকারীদেরকে আলোচনায় বসানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে মোদি সরকার। সোনম ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার পর সেই আলোচনার পথ এখন অনেকটা সহজ হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মোদির সব প্রতিশ্রুতিকে ভণ্ডামি বলে আখ্যা দিয়েছেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবন ও পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ করে তার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি তুলেছে কংগ্রেস ও বিরোধী অন্য কয়েকটি দল। গত মঙ্গলবারের এ ঘটনার পর রাহুল গান্ধী এমনও দাবি করেছেন, পুলিশ সদস্যরা তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তার কানে কানে সরকার পতনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তরুণদের শিক্ষা সংস্কারের আন্দোলনে ঢুকে রাহুল গান্ধীর এমন সব ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ঝেড়েছেন আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদাতা সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমো। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমনপীড়নের জবাবে রাহুল গান্ধীর আকস্মিক বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই পরিবেশ আন্দোলনকর্মী।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাহুল গান্ধীর তীব্র সমালোচনা করে গীতাঞ্জলি বলেন, ২১ জুলাইয়ের এই আন্দোলন ছিল কেবল ‘অসৎ ও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা। রাজনীতিকরণ না করে যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে সরাসরি দাঁড়ানো উচিত ছিল কংগ্রেস নেতাদের।’
গীতাঞ্জলি অ্যাংমো বলেন, রাজনীতিবিদরা এখন ওয়াংচুক ও তার সুনামকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাধারণ জনগণ ও তরুণ সমাজকে আর বোকা বানানো যাবে না।
সব মিলিয়ে ভারতে চলমান আন্দোলনে দ্বিধাবিভক্তির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে মাঝপথে এসে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্দোলনে নিজের অবস্থান কিছুটা শিথিল করেছেন ওয়াংচুক। তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় তাকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এতে অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সিজেপি এখনও নিজেদের অবস্থানে অনড়। সম্পূর্ণ দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তরুণদের এই প্লাটফর্ম। আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও দেশের জনগণের সমর্থনও চেয়েছে তারা। ফলে, কেন্দ্রের আলোচনার আহ্বান ও সংসদে আলোচনা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা এলেও এখনও মোদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি আন্দোলন।
আরটিভি/এসএইচএম



