মাদুরোকে তুলে নিতে ট্রাম্পকে সাহায্য করা সেই ‘গাদ্দার’ আসলে কে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ০১:৫৭ পিএম


মাদুরোকে তুলে নিতে ট্রাম্পকে সাহায্য করা সেই ‘গাদ্দার’ আসলে কে?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে তারই এক ঘনিষ্ঠ সহচর। সেই সন্দেহের তীর এখন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলোর দিকে। ফাইল ছবি

চলতি মাসের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে গিয়ে পুরো বিশ্ব রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে ভেনেজুয়ালের তেল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

বিজ্ঞাপন

তবে, দুর্গের মতো সুরক্ষিত বাসভবনে ঢুকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাদুরোকে যেভাবে তুলে নিয়ে গেল মার্কিন বাহিনী, সেই ব্যাপারটি এখনও অবিশ্বাস্য অনেকের কাছেই। 

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার দুদিন বাদেই ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, মার্কিন বাহিনীর এই অভিযান এত সহজ হয়ে গিয়েছিল মূলত একজন বিশ্বাসঘাতকের কারণেই। মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তি প্রতিনিয়ত ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্টের তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কাছে পাঠাচ্ছিলেন। ফলে অভিযানের সময় মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কে ছিল সেই ‘গাদ্দার’, সেটি জানানো হয়নি। ফলে, ভেনেজুয়েলার সেই ‘গাদ্দার’কে নিয়ে জল্পনা বাড়তেই থাকে। সেই জল্পনার আগুনে এবার ঘি ঢেলে দিয়েছে রয়টার্সই।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ব্রিটিশ বার্তাসংস্থাটি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মাদুরোকে বন্দি করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর সঙ্গে আলোচনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি এখনও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ৬২ বছর বয়সী কাবেলোকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে জানিয়েছিল, তার অধীনে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের ব্যবহার করে যেন বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো না হয়।

কাবেলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী। গত ৩ জানুয়ারির মার্কিন অভিযানের পরও বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই কার্যকর রয়েছে এসব বাহিনী।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে যে অভিযোগে তুলে নিয়েছে, সেই একই মাদক পাচার মামলায় নাম রয়েছে কাবেলোরও। তবে অভিযানের সময় তাকে বন্দি করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।

রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প প্রত্যাবর্তন করার পর থেকেই কাবেলোর সঙ্গে এই যোগাযোগ শুরু হয় এবং মাদুরোকে সরানোর ঠিক আগের সপ্তাহগুলোতেও তা চলে। এমনকি মাদুরোকে অপসারণের পরও কাবেলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ রাখছে বলে চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এই যোগাযোগ এখন ভেনেজুয়েলার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীকে পুরোপুরি মাঠে নামান, তাহলে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কাবেলোর আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ডেলসি রদ্রিগেজ হলেও বিশ্লেষকদের মতে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা ভেস্তে দেওয়ার ক্ষমতা রয়ে গেছে কাবেলোর হাতেই। একটি সূত্র জানায়, কাবেলো সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।

হোয়াইট হাউজ ও ভেনেজুয়েলা সরকার অবশ্য এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত দিয়োসদাদো কাবেলো। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ সহচর কাবেলো পরে মাদুরোর বিশ্বস্ত সহযোগী ও দমননীতির প্রধান প্রয়োগকারী হিসেবে পরিচিতি পান।

তবে, রদ্রিগেজ ও কাবেলো দীর্ঘদিন সরকার, আইনসভা ও ক্ষমতাসীন দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলে ধারণা করা হয়।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা কাবেলো সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখেন। তার সঙ্গে সরকারপন্থি সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কোলেকতিভো’দেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই বাহিনী অতীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, কাবেলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে এক কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে এবং তাকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামে পরিচিত একটি মাদক পাচার চক্রের শীর্ষ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরে এই পুরস্কারের অংক বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। যদিও কাবেলো সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

এ প্রেক্ষাপটে মাদুরোকে অপসারণের পর ওয়াশিংটনে প্রশ্ন ওঠে, তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা কাবেলোকে কেন বন্দি করা হয়নি। এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মারিয়া এলভিরা সালাজার মন্তব্য করেন, ‘কাবেলো মাদুরোর চেয়েও বেশি ভয়ংকর হতে পারেন।’

এরপর কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা করে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা আত্মসমর্পণ করবে না।’ তবে সাম্প্রতিক দিনে নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে তল্লাশির খবর কমে এসেছে। একইসঙ্গে ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক বন্দিদের একটি অংশ মুক্তি পাবে।

ভেনেজুয়েলা সরকারের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাবেলোই এই মুক্তি প্রক্রিয়া তদারক করছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মুক্তির গতি অত্যন্ত ধীর এবং এখনো শত শত মানুষ অন্যায়ভাবে বন্দি রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং তেলসমৃদ্ধ দেশটির সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেতে কাবেলোর মতো কয়েকজন মাদুরো-ঘনিষ্ঠ নেতার ওপর নির্ভর করছে। তবে, তার দমনমূলক অতীত এবং রদ্রিগেজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস এখনও ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ডেলসি রদ্রিগেজ এরই মধ্যে নিজের ক্ষমতা সংহত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অনুগতদের বসাচ্ছেন এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তেল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলা বিষয়ে বিশেষ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনকারী এলিয়ট আব্রামস বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটাতে হলে একপর্যায়ে কাবেলোকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে—এমন প্রত্যাশা অনেক ভেনেজুয়েলাবাসীর রয়েছে। যেদিন কাবেলো বিদায় নেবেন, সেদিনই মানুষ বুঝবে যে প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission