সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে ভারি বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চলতি বছর (২০২৫) জুন মাসের শেষদিক থেকে শুরু হওয়া মৌসুমি বৃষ্টিতে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (এনডিএমএ) ও বিভিন্ন প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ।
এরই মধ্যে চীনা ও পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তানের অন্যতম ব্যস্ত ও নয়নাভিরাম এন-১৫ মহাসড়কে ব্যাপক হারে ভূমিধস বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৃষ্টি ও তাপমাত্রাই দায়ী।‘পর্যটন মহাসড়ক’ নামে পরিচিত এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে উষ্ণতা বৃদ্ধি, বরফ গলে যাওয়া এবং বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা পাহাড়ের ঢালকে ক্রমশ অস্থিতিশীল করে তুলছে বলেও গবেষণায় পাওয়া যায়। এই গবেষণাটি ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করছে। খবর দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের।
গবেষক দলটি ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪৫৫টি উপগ্রহ চিত্র ও জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এতে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে বালাকোট, বাবুসার টপ, নারান এবং চিলাস অঞ্চল জুড়ে কমপক্ষে ৩৩৫টি ভূমিধসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমিধসের ঘটনা ধীরে ধীরে বাড়লেও ২০০৫ সালের পর এর তীব্রতা অনেক বেড়েছে, যা এই অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং দ্রুত বরফ গলে যাওয়ার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকরা আরও জানায়, ৮৪ শতাংশেরও বেশি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে উষ্ণ মৌসুমে (এপ্রিল-অক্টোবর)। এছাড়া, ৮৬ শতাংশের বেশি ভূমিধস ৪০ ডিগ্রির চেয়ে বেশি ঢালযুক্ত এলাকায় ঘটেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, এন-১৫ মহাসড়কের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক এবং জলবায়ুগত গঠনের ভিন্নতার কারণে ভূমিধসের কারণগুলোও আলাদা। যেমন, বালোকোট অঞ্চলে উপক্রান্তীয় জলবায়ু বিরাজ করায় সেখানে উচ্চ বৃষ্টিপাত (বরফ ও বৃষ্টি আকারে জলীয় পদার্থ) ভূমিধসের প্রধান চালিকাশক্তি।
অন্যদিকে, বাবুসার টপ থেকে নারান পর্যন্ত এলাকাটি আলপাইন প্রকৃতির (বৃক্ষসীমার উপরে), যেখানে মাটির অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত সম্মিলিতভাবে ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এর বিপরীতে, চিলাস হলো একটি প্রায় শুষ্ক অঞ্চল। সেখানে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি মূলত ভূমিধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পার্থক্যটি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট এলাকার ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর নাজির আহমেদ বাজাই জানান, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বর্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলেন। তবে সীমিত অবকাঠামো থাকায় তাদের প্রতিক্রিয়া সক্রিয় নয়, বরং প্রতিক্রিয়াশীল। উল্লেখ্য, ২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পাকিস্তানে ভূমিকম্প ছাড়া ভূমিধসে ১৫৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে গবেষক নাজির আহমেদ বাজাই প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক উভয় উপায়ে সমস্যার মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব করেন, প্রথমে বালোকোট এবং নারানের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে স্থিতিশীল করতে কম খরচের জৈব প্রকৌশল পদ্ধতি অর্থাৎ গভীর শিকড়যুক্ত উদ্ভিদ রোপণ করা যেতে পারে।
পাশাপাশি, অবকাঠামোগত সুরক্ষার অংশ হিসেবে মহাসড়কের পাশে প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরি এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি করা প্রয়োজন, যা ভূমিধসের তীব্রতা কমাতে সহায়ক হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাবুসার পাসের মতো নাজুক অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা এবং বরফ গলার হার রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করার জন্য কম খরচের সেন্সর ব্যবহার করা, যাতে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের সময়মতো সতর্ক করা সম্ভব হয়।
ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ডের ড. মেলানি ফ্রুড ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘গবেষণা, নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষা’ এই ত্রিমুখী নীতির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা, উপযুক্ত নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং সাধারণ মানুষকে কম খরচে নিরাপদ ঢাল স্থিতিশীল করার সহজ পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষিত করার পরামর্শ দেন।
আরটিভি/এআর





