মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সখ্যতা প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো। মিশরীয়দের কাছে এরা ছিল পবিত্র, আর আমাদের কাছে আজও এরা ঘরের উষ্ণতা ও নিস্তব্ধতার প্রতিচ্ছবি। অথচ এই একই প্রাণী, যে মুহূর্তে মানুষের আদর ছাড়িয়ে বন্য পরিবেশে মিশে যায়, তখন সে হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ ও নির্দয় শিকারি। তাইতো নিউজিল্যান্ড, যা তার অনন্য বন্যপ্রাণীর জন্য বিশ্বখ্যাত, সেই দেশেই এখন বন্য বিড়াল বা মালিকানাহীন বিড়ালদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে এক চরম অভিযান। এই অভিযান কেবল একটি প্রাণীর বিরুদ্ধে নয়, এটি নিউজিল্যান্ডের অদ্বিতীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক জীবন-মরণ যুদ্ধ।
দেশের সংরক্ষণমন্ত্রী তামা পোতাকা গত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) ঘোষণা করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে সব বন্য বিড়ালকে নির্মূল করা হবে। এই প্রাণীটিকে এবার নিউজিল্যান্ডের বিশ্বস্বীকৃত ‘প্রিডেটর-ফ্রি ২০৫০’ তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে এই উদ্যোগ চালু হওয়ার পর এবারই প্রথম কোনো নতুন শিকারি প্রাণীকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো। দীর্ঘদিন ধরেই বন্য বিড়ালদের ধরা বা মেরে ফেলার মতো বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চলছিল, তবে তালিকায় যুক্ত হওয়ায় এবার তাদের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও বৃহৎ আকারের জাতীয় নির্মূল কর্মসূচি শুরু হবে।
সংরক্ষণমন্ত্রী পোতাকা বন্য বিড়ালকে আখ্যা দিয়েছেন ‘স্টোন-কোল্ড কিলার’ বা নির্দয় শিকারি হিসেবে। রেডিও নিউজিল্যান্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বনভূমির সৌন্দর্য বজায় রাখা এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এসব হত্যাকারীকে সরিয়ে ফেলতেই হবে।’
নিউজিল্যান্ডের বনভূমি ও উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি বন্য বিড়াল ও মালিকানাহীন বিড়ালের অবাধ বিচরণ। লেজসহ এসব বিড়ালের দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটার এবং ওজন সাত কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক বন্য বিড়াল সে দেশের দুর্লভ প্রাণিজগৎ ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। এদের আগ্রাসনের কারণে রাকিউরা স্টুয়ার্ট দ্বীপে পুকুনুই বা সাউদার্ন ডটারেল প্রজাতির পাখি প্রায় বিলুপ্তির মুখে এবং মাউন্ট রুয়াপেহু এলাকায় তারা প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০ বাদুড় শিকার করায় সেই প্রজাতিও মারাত্মকভাবে হুমকিতে।
বন্য বিড়ালকে তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অতীতে তীব্র জনমত বিরোধিতা দেখা গেলেও, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খসড়া কৌশল নিয়ে জনমতের ৯০ শতাংশই বন্য বিড়াল নির্মূল করার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে গৃহপালিত বিড়াল এ তালিকায় না থাকলেও, পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়াল পালনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে থাকা নিউজিল্যান্ডে সেগুলোর ভূমিকাও যে জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এই নির্মূল কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করবে।
আরটিভি/এআর





