টানা ১৪ দিন ধরে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত। এই অবস্থায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানের পক্ষে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন।
শুক্রবার(১৩ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। এসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়া ও চীন। বৈঠকের মধ্যেই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ তোলে দুই পক্ষ।
জানা যায়, নিরাপত্তা পরিষদের চলতি মাসের সভাপতি হিসেবে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তদারকি সংক্রান্ত ‘১৭৩৭ কমিটি’র কার্যক্রম সক্রিয় করার প্রস্তাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া ও চীন এই আলোচনা ঠেকানোর চেষ্টা করলেও ভোটাভুটিতে তা ব্যর্থ হয়। ১১–২ ভোটে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব পাস হয় এবং দুটি দেশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে। বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ সরাসরি অভিযোগ করেন, মস্কো ও বেইজিং তাদের প্রতিরক্ষা অংশীদার ইরানকে রক্ষা করতে বিশ্বনিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া এই কমিটির কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে।
মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্র যারা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে এবং আইএইএ-কে পরিদর্শনের পূর্ণ সুযোগ দিচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের কারণে যে হুমকি তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলার জন্যই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল জরুরি। তবে এই অভিযোগকে ‘অযথা আতঙ্ক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর অজুহাত খুঁজতেই ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে চীনের প্রতিনিধি ফু ছং এই সংকটের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকেই ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি বলেন, একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার কথা বলা আর অন্যদিকে ইরানের ওপর প্রকাশ্য শক্তি প্রয়োগ করা—যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিচারিতা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে।
তবে এর জবাবে ব্রিটেন ও ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে জানায়, আন্তর্জাতিক উদ্বেগের যথাযথ জবাব না দেওয়ায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
বৈঠক শেষে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি সাংবাদিকদের জানান, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবসময়ই শান্তিপূর্ণ ছিল এবং কোনো ধরনের নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরান মেনে নেবে না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান কারণ। এই মাসের শুরুতে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের জুন মাসে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা না চালালে দুই সপ্তাহের মধ্যেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারত। তবে কিছু সূত্র বলেছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে এ দাবির সমর্থন পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারকে হত্যা করে তারা। সেইসঙ্গে হত্যা করা হয় ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারকেও। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরানও। ১৪ দিন ধরে চলমান এই হামলা-পাল্টা হামলায় ইতোমধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।
আরটিভি/এআর




