যেভাবে ফাঁস হয়েছিল ইসরায়েলের গোপন পারমাণবিক বোমা বানানোর তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ 

মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬ , ১১:৩১ পিএম


যেভাবে ফাঁস হয়েছিল ইসরায়েলের গোপন পারমাণবিক বোমা বানানোর তথ্য
মোরদেকাই ভানুনু। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ২৫ দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সপরিবারে হত্যা করা হলেও, তেহরান এখন পাল্টা আঘাতে ইসরায়েলকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে শনিবার (২১ মার্চ) রাতে ইসরায়েলের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত ‘ডিমোনা’র কাছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত দেশটিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

ইসরায়েলের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ডিমোনা শহর। অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে পারমাণবিক কেন্দ্রের এত কাছে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার ঘটনা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মহলে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

বিজ্ঞাপন

ডিমোনার এই সংবেদনশীল এলাকার এত কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মহলে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, তার শিকড় প্রোথিত আছে আশির দশকের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাসে। যে গোপন পারমাণবিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইসরায়েল দাপট দেখায়, তার হাঁড়ির খবর প্রথম ফাঁস করেছিলেন তাদেরই এক সাধারণ টেকনিশিয়ান মোরদেকাই ভানুনু।

আরও পড়ুন

মোরদেকাই ভানুনু ছিলেন একজন মরক্কান ইহুদি। ১৯৭৭ সালে তিনি ‘নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার’ বা ডিমোনা প্ল্যান্টে টেকনিশিয়ান ও শিফট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ৯ বছর সেখানে কাজ করার সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে ইসরায়েল বিশ্বকে ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের’ কথা বলে গোপনে তৈরি করছে ভয়ংকর সব পারমাণবিক অস্ত্র।

বিজ্ঞাপন

১৯৮২ সালে ইসরায়েল হামলা করে লেবাননে। ভানুনুকে এ সময় ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে অতিরিক্ত (রিজার্ভ) সৈন্য হিসেবে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। তিনি মানা করে দেন, শুধু রান্নাঘরে কাজ করেন এ সময়ে। এটা অবশ্য দেশটির নীতি, কাউকে সেনাবাহিনী ডাকলে যেতেই হয়, তা সে যে কাজের জন্যই হোক।

ভানুনু পেশায় প্রকৌশলী হলেও আদর্শগতভাবে ছিলেন শান্তিকামী। তিনি একসময় উপলব্ধি করেন, তার দেশ গোপনে ১০০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে, যা ইসরায়েলকে পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করেছে। 

শান্তিকামী ভানুনুর গণহত্যার এই অস্ত্রের প্রতি ঘৃণা এবংফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেন, এই সত্য বিশ্বকে জানাবেন।

আরও পড়ুন

যেমন ভাবনা তেমনই কাজ করে বসেন ভানুনু। ১৯৮৫ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার আগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক দুঃসাহসিক কাজ করেন তিনি। ডিমোনা প্ল্যান্টের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ফাঁকি দিয়ে তিনি একটি ক্যামেরা নিয়ে যান ভেতরে। কখনো মোজার ভেতরে ফিল্ম লুকিয়ে, কখনো গভীর রাতে বা খুব ভোরে তিনি তুলে ফেলেন পারমাণবিক কেন্দ্রের ভেতরের শত শত গোপন ছবি।

শোনা যায়, এর কিছুদিন পরই তিনি যোগ দেন ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টিতে। তবে এ সময় তিনি বেরিয়ে পড়েন, বলা যায়, একরকম বিশ্বভ্রমণে। ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন দেশে—গ্রিস, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, কাঠমান্ডু, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি। 

এদিকে ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির একটি সাধারণ হোটেলে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হাউন্যামের সঙ্গে দেখা হয় ভানুনুর। প্রথম দেখায় ভানুনুকে দেখে কোনো পরমাণু বিজ্ঞানী মনে হয়নি হাউন্যামের। ছোটখাটো গড়ন, মাথায় হালকা টাক—খুবই সাধারণ এক মানুষ। কিন্তু তার কাছে থাকা ছবি ও তথ্যগুলো দেখে হাউন্যামের প্রথমে বিশ্বাস করতেই যেন কষ্ট হচ্ছিল। তাই তার দেওয়া তথ্য ও ছবি যাচাই করতে ভানুনুকে নিয়ে আসেন লন্ডনের সানডে টাইমসে । সেখানে পত্রিকাটির অফিসে কয়েক দিন ধরে চলে তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। কিন্তু ভানুনু বুঝতে পারেননি, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ততক্ষণে তার পিছু নিয়েছে।

লন্ডনে অবস্থানকালে ভানুনু ‘সিন্ডি’ নামে এক মার্কিন পর্যটকের প্রেমে পড়েন। কিন্তু তিনি জানতেন না সিন্ডি ছিলেন মূলত মোসাদের একজন এজেন্ট (চেরিল বেনটভ)। 
যুক্তরাজ্যের মাটি থেকে কাউকে অপহরণ করলে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে, এই ভাবনায় মোসাদ ভানুনুকে টোপ দিয়ে ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সাংবাদিক হাউন্যাম তাকে বারবার সতর্ক করলেও একসময় ভানুনু সিন্ডির সাথে ইতালিতে ঘুরতে যেতে রাজি হন।

রোমে পৌঁছানোর পরপরই মোসাদ এজেন্টরা তাকে ড্রাগ দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর জাহাজে করে তাকে গোপনে ইসরায়েলে নিয়ে আসা হয়। এক মাস নিখোঁজ থাকার পর ইসরায়েল স্বীকার করে ভানুনু তাদের হেফাজতে আছেন এবং তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা হবে।

এই মামলায় আদালত ভানুনুকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এর মধ্যে দীর্ঘ ১১ বছর তিনি কাটান ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’ বা নিঃসঙ্গ কারাবাসে— যেখানে একটি ছোট ঘরে তিনি সম্পূর্ণ একা ছিলেন। 

২০০৪ সালে মুক্তি পেলেও তার ওপর আরোপ করা হয় কঠোর বিধিনিষেধ। তিনি দেশ ছাড়তে পারবেন না, সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে পারবেন না, এমনকি ইন্টারভিউ দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বারবার গ্রেফতার করা হয়। 

তবে শান্তিকামী ভানুনু আজও  অনুতপ্ত নন। তিনি গর্বের সাথে বলেন, "আমি যা করেছি তার জন্য আমি গর্বিত। আমার কাছে আর কোনো গোপন তথ্য নেই, আমি শুধু সত্যটা পৃথিবীকে জানাতে চেয়েছি।"

ইসরায়েল আজও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা স্বীকার করেনি, কিন্তু ভানুনুর ফাঁস করা সেই তথ্যই আজ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। 

আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission