ইরানের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক ঘাঁটির ওপর উপর্যুপরি হামলা চালাতে গিয়ে নিজেদের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী 'জেএএসএসএম-ইআর' ক্রুজ মিসাইলের প্রায় পুরো ভাণ্ডারই খালি করে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে সম্ভাব্য যেকোনো বড় সংঘাত বা যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য আপদকালীন সংরক্ষিত মজুদ থেকেও এখন এই দূরপাল্লার বিধ্বংসী মিসাইলগুলো সরাতে বাধ্য হচ্ছে পেন্টাগন।
এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সরাসরি অবগত আছেন এমন এক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রতিটি ১৫ লাখ ডলার মূল্যের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই মিসাইলগুলো গত মার্চের শেষ নাগাদ প্যাসিফিক কমান্ডের মজুদ থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন চলমান যুদ্ধক্ষেত্র এবং যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে এসব মারণাস্ত্র অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দ্রুত মোতায়েন করা হচ্ছে।
সামরিক তথ্য অনুযায়ী চলমান এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে খোদ আমেরিকার কাছে সব মিলিয়ে সর্বমোট ২৩০০টি এই 'জেএএসএসএম-ইআর' ক্রুজ মিসাইলের শক্তিশালী মজুদ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহেই তারা অন্তত ১০০০টির বেশি মিসাইল খরচ করে ফেলেছে।
এদিকে, বর্তমানে এই স্থানান্তরের পর বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য সব মিলিয়ে মাত্র ৪২৫টি এই ধরনের মিসাইল অবশিষ্ট থাকবে যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ফুরিয়ে আসা এই সীমিত মজুদ দিয়ে মাত্র ১৭টি বি-১বি বোমারু বিমানের একটি একক মিশন পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়াও ত্রুটি বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আরও ৭৫টির মতো মিসাইল বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।
যদিও হোয়াইট হাউস এবং ইসরায়েলের সামরিক কমান্ড যৌথভাবে দাবি করছে, তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ বোমাবর্ষণ করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। কারণ এই তথাকথিত সফলতার মধ্যেও গত শুক্রবার(৩ এপ্রিল) একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ফাইটার বিমান ইরানের ভূখন্ডে ভূপাতিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এরপর একটি শক্তিশালী এ-১০ অ্যাটাক জেট এবং পাইলট উদ্ধার করতে যাওয়া দুটি বিশেষ হেলিকপ্টারও ইরানি বিমানবাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের হামলায় ১২টিরও বেশি পেন্টাগনের অত্যন্ত চৌকস এমকিউ-৯ ড্রোন আকাশে ছাই হয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক উসকানিমূলক ভাষণে ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তারা ইরানকে এমন এক চরম অবস্থায় নিয়ে যাবেন যা তাদের প্রাপ্য। মার্কিন মেরিন ও প্যারাট্রুপাররা ইরানের প্রধান তেল টার্মিনাল 'খার্গ দ্বীপ' সশরীরে দখলের গভীর পরিকল্পনা করছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে। তবে দূরপাল্লার ও দামি মিসাইল শেষ হয়ে আসায় এখন বাধ্য হয়ে পুরোনো আমলের বি-৫২ বোমারু বিমান উড়িয়ে বেশ সস্তা ও সাধারণ জেডিএএম বোমা ফেলার এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল নিচ্ছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র।
আক্রমণাত্মক মেজাজে থাকা মার্কিন বাহিনীর বিপরীতে হাত গুটিয়ে বসে নেই ইরানও। আঞ্চলিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে ইরান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ১৬০০টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪০০০-এর বেশি আত্মঘাতী শাহেদ ড্রোন ছুড়েছে।
ইরানের ছোড়া ঝাঁকে ঝাঁকে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষামূলক দামি ক্ষেপণাস্ত্রও শেষের পথে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও আরটিএক্স কর্পোরেশন রাতদিন এক করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালালেও যুদ্ধের তীব্রতার তুলনায় তা যৎসামান্য। ফলে দীর্ঘমেয়াদী এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমেরিকার সামগ্রিক বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতা এবার সত্যিই এক বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরটিভি/এআর




