ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চলের আফকাড্ডে— একটি অন্ধকার রাস্তার পাশের ছোট রেস্তোরাঁ। রান্নার ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে আছে পোড়ানো ‘মির’-এর গন্ধ। পোকামাকড় ও সাপ তাড়াতে এখানে মির পোড়ানো হয়। অথচ এই মিরই বিশ্বের নামী সুগন্ধি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা এখন ঐতিহাসিক খরার কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে।
এই মূল্যবান রেজিন পাওয়া যায় কমিফোরা মিরা (Commiphora myrrha) নামে গাছ থেকে, যা হর্ন অব আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে জন্মায়। একসময় এই গাছগুলো ঘন বন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এখন পানির অভাব এবং ক্ষুধার্ত গবাদিপশুর আক্রমণে গাছগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি আমেরিকান হারবাল প্রোডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং বোর্ন গ্লোবালের সহায়তায় একদল গবেষক এই অঞ্চল পরিদর্শন করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল— মির সংগ্রহকারীরা যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত ঘুরে নয়, সরাসরি বাজারে বিক্রি করে ন্যায্য দাম পান।
ইথিওপিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান মির উৎপাদক দেশ। প্রাচীন প্রাচীন মিশরের সময় থেকেই সৌন্দর্যচর্চা, চিকিৎসা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মির ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখানকার মানুষ এখনও ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে গাছের স্বাভাবিক ক্ষত থেকে রেজিন সংগ্রহ করেন— যা গাছকে সুরক্ষিত রাখে এবং উচ্চমানের মির উৎপাদনে সহায়ক।
তবে এত পরিশ্রমের পরও সংগ্রাহকদের আয় খুবই কম। প্রতি কেজি মির বিক্রি করে তারা মাত্র ৩ দশমিক৫০ থেকে ১০ ডলার পান। অথচ এই মির ব্যবহার করে তৈরি সুগন্ধি বিশ্ববাজারে ৫০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। এই সুগন্ধিগুলো বাজারজাত করে টম ফোর্ড, কোম দে গারসঁ এবং জো ম্যালোনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা পরিস্থিতি দিন দিন তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত বৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে, আর ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক গাছগুলো বেঁচে থাকলেও রেজিন উৎপাদন কমে গেছে, আর নতুন চারাগাছ টিকে থাকতে পারছে না।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, শিশুরা গবাদিপশু চরাতে গিয়ে অনেক সময় ছোট চারাগাছ উপড়ে ফেলে, আবার পশুরা নতুন কুঁড়ি খেয়ে ফেলে। এতে মির গাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
পানির সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পশুপালককে পানির সন্ধানে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। একটি মাত্র কূপের চারপাশে শত শত গবাদিপশুর ভিড় দেখা যায়। সেখানে প্রথমে অতিথিদের পশুকে পানি খাওয়ানো হয়, তারপর গ্রামের মানুষ পানি পায়।
সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য মির সংগ্রহই একমাত্র আয়ের উৎস। তাই তারা আশা করছেন, যদি সরাসরি বাজারব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে তারা ন্যায্য দাম পাবেন এবং টিকে থাকতে পারবেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা— যদি খরা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয়, তাহলে একসময় এই মির গাছ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। আর এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে হাজারো মানুষের জীবিকা ও একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। সূত্র: ইয়াহু
আরটিভি/এমএইচজে




