যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে কোনো কার্যকর সমঝোতা না হওয়ায় আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক সদর দপ্তর। বর্তমান যুদ্ধবিরতি যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে বলেও জানায় সংস্থাটি। তেহরানের মতে মার্কিন প্রশাসনের নেতিবাচক আচরণ এবং ক্রমাগত উসকানি পরিস্থিতিকে আবারও রণক্ষেত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শনিবার (২ মে) ইরানের সামরিক সদর দপ্তরের ডেপুটি মোহাম্মদ জাফর আসাদি ফারস নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ কথা জানান। খবর আল জাজিরার।
আসাদি জানান, মার্কিন কর্মকর্তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য মূলত মিডিয়া-কেন্দ্রিক এবং এর পেছনে দুটি প্রধান লক্ষ্য কাজ করছে। প্রথমত তারা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া ঠেকাতে চায় এবং দ্বিতীয়ত তারা নিজেদের তৈরি করা রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে কোনো চুক্তি বা সনদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার প্রমাণ দিতে পারেনি যা বর্তমান আলোচনাকে আরও অবিশ্বাসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আমেরিকানদের যেকোনো ‘বোকামি’ বা নতুন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ইরানি সামরিক সদর দপ্তর তাদের বিবৃতিতে আরও জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকে শুরু করে ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা এবং পরবর্তী যুদ্ধবিরতির সময় পর্যন্ত তেহরান যথেষ্ট নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে।
ইরান মনে করে, শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে ইরানের পক্ষ থেকে সব ধরনের ছাড় দেওয়া হলেও ওয়াশিংটন তার কোনো ইতিবাচক প্রতিদান দেয়নি। বরং আলোচনার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ জোরদার করেছে এবং ইরানের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে বলে তেহরান অভিযোগ তুলেছে। এমতাবস্থায় ইরানের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং এখন যুদ্ধ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে।
এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।
এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৩৮ দিন হামলা-পাল্টা হামলার পর গত ৭ এপ্রিল ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুইপক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর হামলা চালায়নি। তবে, কোনও ধরনের সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারেনি তারা।
আরটিভি/এআর



