জাপানের একমাত্র নারী গ্যাংস্টারের উত্থান-পতনের গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ , ০৪:৪৪ এএম


জাপানের একমাত্র নারী গ্যাংস্টারের উত্থান-পতনের গল্প
মাকো নিশিমুরা। ছবি: সংগৃহীত

জাপানের ভয়ংকর অপরাধজগত ‘ইয়াকুজা’— যেখানে নারীদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব বলেই ধরা হয়। সেই পুরুষশাসিত অন্ধকার দুনিয়ায় প্রায় চার দশক টিকে ছিলেন এক নারী। তার নাম মাকো নিশিমুরা। সহিংসতা, মাদক, চাঁদাবাজি, যৌনপল্লী নিয়ন্ত্রণ— সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাপানের ইতিহাসের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নারী ইয়াকুজা সদস্য। তবে সেই উত্থানের শেষ হয়েছিল নিঃসঙ্গতা, আসক্তি আর অনুশোচনায়।

বর্তমানে ৫৯ বছর বয়সী নিশিমুরা গিফু শহরের ছোট্ট এক ফ্ল্যাটে থাকেন। শরীরজুড়ে ট্যাটু, বাঁ হাতের কাটা কনিষ্ঠ আঙুল আর অতীতের স্মৃতি— এসবই এখন তার পরিচয় বহন করে। তবে অপরাধজগত ছেড়ে আজ তিনি কাজ করছেন সাবেক ইয়াকুজা সদস্যদের পুনর্বাসনে।

১৯৮৬ সাল। বয়স তখন মাত্র ১৯। গিফু শহরে পালিয়ে থাকা কিশোরী নিশিমুরা এক রাতে ফোন পান— তার গর্ভবতী বান্ধবী আয়াকে কয়েকজন ঘিরে রেখেছে। হাতে বেসবল ব্যাট নিয়ে ছুটে যান তিনি। হামলাকারীদের একজন আয়াকে পেটে লাথি মারতেই নিশিমুরা ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু সেই ঘটনার খবর পৌঁছে যায় জাপানের কুখ্যাত অপরাধচক্র ইয়াকুজাদের কানে। কিছুদিন পর তাকে দলে ভেড়ানোর প্রস্তাব আসে।

তখন তিনি ‘ওয়ার্স্ট’ নামে এক মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের সদস্য। সাদা জাম্পস্যুট পরে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াত সেই দল। একইসঙ্গে চলছিল মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও যৌনপল্লী নিয়ন্ত্রণ।

একসময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় ইয়াকুজা নেতা রিওচি সুগিনোর। খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হলেও গিফু শহরে তার ছিল বিশাল প্রভাব। নিশিমুরা পরে বলেন, তার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল।

২০ বছর বয়সে ইয়াকুজার ঐতিহ্যবাহী ‘সাকাজুকি’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনে যোগ দেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানে একসঙ্গে সাকে পান করার মধ্য দিয়ে নেতার প্রতি আজীবন আনুগত্যের শপথ নিতে হয়।

নিশিমুরা বলেন, ইয়াকুজার মতো যা কিছু ছিল, আমি সব করতাম।

ইয়াকুজা দুনিয়ায় নারী সদস্য প্রায় ছিল না বললেই চলে। তবু সহিংসতা আর ব্যবসায়িক দক্ষতায় দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করেন নিশিমুরা। প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে ডাকত 'ছোটখাটো মানুষ' বলে।

তিনি মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, যৌনপল্লীতে নারী সরবরাহ— সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ঋণে জর্জরিত বা মাদকাসক্ত নারীদের খুঁজে এনে জোর করে যৌনপেশায় ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

একবার এক তরুণী পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে এনে ফের যৌনপল্লীতে পাঠান নিশিমুরা। পরে সেই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলে তিনি বুঝতে পারেন, তার জীবন ধ্বংসে নিজেরও বড় ভূমিকা ছিল।

মেথামফেটামিনে ভয়াবহভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন নিশিমুরা। যদিও তার গ্যাং মাদক সেবন নিষিদ্ধ করেছিল। বিষয়টি ধরা পড়লে তাকে ইয়াকুজা নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমা চাইতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুল কাটতে হয়।

একটি ছোট তলোয়ারের ওপর আঙুল চেপে নিজেই কেটে ফেলেন তিনি। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকরা ক্ষত সেলাই করেন। সেই ঘটনার পর অন্য ইয়াকুজা সদস্যরাও তার কাছে এসে নিজেদের আঙুল কাটতে সাহায্য চাইত।

মাদক রাখার দায়ে কারাদণ্ডও হয় নিশিমুরার। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তাকে ইয়াকুজারা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতায় বরণ করে নেয়।

এরই মধ্যে এক প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং সদস্যের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। পরে মা হন নিশিমুরা। সন্তান জন্মের পর জীবনে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। মাদক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি বলেন, এর আগে কখনও কারও জন্য মরতে চাইনি। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর মনে হয়েছিল, তাদের জন্য আমি মরতেও পারি।

১৯৯০-এর দশকে জাপানে কঠোর ইয়াকুজাবিরোধী আইন চালু হয়। ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যবসা পরিচালনা— সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে ইয়াকুজা সাম্রাজ্য।

নিশিমুরাও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু শরীরজুড়ে ট্যাটু আর কাটা আঙুল দেখে চাকরি দিতে চাইত না কেউ। শেষ পর্যন্ত আবার মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

পরিবারও ভেঙে যায়। সন্তানদের হেফাজত হারান। মা-ভাইয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

পরবর্তীতে সাবেক ইয়াকুজা সদস্য সাতোরু তাকেগাকির সঙ্গে পরিচয়ের পর জীবন বদলাতে শুরু করে নিশিমুরার। তিনি যোগ দেন সাবেক অপরাধীদের পুনর্বাসন সংগঠন ‘গোজিনকাই’-এ।

বর্তমানে তিনি মাদকাসক্ত ও সাবেক ইয়াকুজাদের সমাজে ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন। চাকরি খুঁজে দেওয়া, পুনর্বাসন— সবকিছুতেই সাহায্য করেন।

বহু বছর পর সম্প্রতি মা ও ভাইয়ের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়েছে তার। সেই সাক্ষাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই।

নিশিমুরার ভাষায়, আমি বুঝেছি পরিবার কত গুরুত্বপূর্ণ।

আর তার মায়ের চোখে এখনও তিনি সেই আদরের মেয়ে। কাঁদতে কাঁদতে মা বলেন, প্রতিদিন আমি ওর কথা ভাবতাম। কারণ ও খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission