পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙনের সুর দেখা দিয়েছে। দলটির প্রায় ৫০ জন বিধায়ক তৃণমূল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দাবি উঠেছে। দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত জাতীয় মুখপাত্র রিজু দত্ত জানিয়েছেন, এই ক্ষুব্ধ বিধায়করা শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের বিখ্যাত জোড়াফুল প্রতীক দাবি করতে পারেন।
ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিজু দত্ত বলেন, ‘আমার সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৫০ জন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙার উপায় খুঁজছেন।’ নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন এবং তারা এটিকেই আসল তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন বলে তিনি জানান। তবে রিজু দত্তের এই দাবি এখন পর্যন্ত অন্য কোনও সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারই সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিধায়কদের জাল স্বাক্ষরের বিতর্ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা নামের দুই বিধায়ককে বহিষ্কার এবং অন্যান্য প্রবীণ নেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরে এই বিদ্রোহের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে।
সোমবার(১ জুন) একটি ফেসবুক লাইভে এসে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের ভেতরের এই ফাটলের কথা স্বীকার করেছেন। মমতা বলেন, তৃণমূলের বিধায়কদের পুলিশের মাধ্যমে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ হাত জোড় করে বিদ্রোহী বিধায়কদের বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, দলীয় নেতৃত্বকে না জানিয়ে একটি গোপন বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছেন। একে ‘দলবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে কুণাল ঘোষ বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ব্যবহার করে এবং তার উপার্জিত ভোট পেয়েই আমরা এখানে এসেছি। লোকের বিবেক বলে কিছু থাকা উচিত।’
এদিকে কলকাতার একটি বাংলা নিউজ চ্যানেল এবিপি আনন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আলাদা দল গঠনের কোনও উদ্যোগের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেন, ‘তৃণমূলে কথা বলার কোনও জায়গা নেই, এটা সবাই জানে। তৃণমূল দলটি বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে এবং এটি আর টিকবে না। শুধু আমি নই, আমাদের অনেক প্রবীণ সংসদ সদস্য এবং নেতাও একই কথা বলছেন।’ সোমবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার একটি হোটেলে বিধায়কদের সঙ্গে গোপন বৈঠকের দাবিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তৃণমূলের এই উৎকণ্ঠার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। গত ৩১ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠক ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের থাকা ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনই এড়িয়ে গেছেন। দল ভাঙার ক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে মোট বিধায়কের দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৫৩ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রয়োজন হয়, যা রিজু দত্তের দাবি করা ৫০ জনের কাছাকাছি।
এর আগে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার বিরুদ্ধে সরব হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। প্রবীণ রাজনীতিক ঋতব্রত তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন সিপিআই (এম)-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের মাধ্যমে। পরে ২০২০ সালে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উলুবেড়িয়া পূর্ব আসন থেকে জয়ী হন। দল থেকে বহিষ্কারের পর সোমবার তিনি তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরও যেখানে সাধারণ সম্পাদককে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়, সেই দলে কথা বলার কোনও সুযোগ নেই।
আরটিভি/এআর



