চার দিনের প্রবল বৃষ্টিতে বিশ্বের বিরল ওরাংওটানদের ৭ শতাংশ মারা গেছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ 

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ , ০৫:৪৫ পিএম


চার দিনের প্রবল বৃষ্টিতে বিশ্বের বিরল ওরাংওটানদের ৭ শতাংশ মারা গেছে
ছবি: বিবিসি

গত নভেম্বরের শেষের দিকে সুমাত্রা দ্বীপে আঘাত হেনেছিল সাইক্লোন ‘সেনিয়ার’। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে চার দিনের টানা অতি বৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন প্রজাতির ওরাংওটাং এখন বিলুপ্তির আরও দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। নতুন এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, গত নভেম্বরের ওই চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে 'তাপানুলি ওরাংওটাং' প্রজাতির অন্তত ৫৮টি প্রাণী মারা গেছে। বিশ্বজুড়ে চরম বিপন্ন এই প্রজাতির ৮০০টিরও কম প্রাণী বেঁচে ছিল। সেই হিসেবে, মাত্র চার দিনেই এই প্রজাতির প্রায় ৭ শতাংশ প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেছে। 

বুধবার প্রকাশিত এই গবেষণায় জানানো হয়, এটি একটি রক্ষণশীল হিসাব মাত্র। বৃষ্টির কারণে বনভূমির ক্যানোপির ক্ষতি এবং খাদ্যাভাবের কারণে কতগুলো প্রাণী মারা যেতে পারে, তা এই হিসাবে ধরা হয়নি। 

গত নভেম্বরের শেষের দিকে সুমাত্রা দ্বীপে আঘাত হেনেছিল সাইক্লোন 'সেনিয়ার'। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। 

গবেষকেরা বলছেন, তাদের এই ফলাফল প্রমাণ করে যে অতি বৃষ্টির মতো চরম প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো গ্রেট এপ প্রজাতির অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠতে পারে। 

সাইক্লোনে দ্বীপটির বন্য প্রাণীদের ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা পরিমাপ করা বেশ কঠিন। 

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সংরক্ষণবিদেরা ঝড়ের পর থেকেই লক্ষ করেছিলেন যে তাপানুলি ওরাংওটাংয়ের দেখা প্রায় মিলছেই না। এর ফলে আশঙ্কা তৈরি হয় যে এই প্রাণীগুলো হয়তো বন্যা ও ভূমিধসে ভেসে গেছে।

বুধবার প্রকাশিত গবেষণার অন্যতম রচয়িতা এবং ব্রুনাইয়ের 'বোর্নিও ফিউচারস'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক এরিক মেইজার্ড ডিসেম্বরে বিবিসিকে বলেছিলেন, সাইক্লোন সেনিয়ারের কারণে অন্তত ৩৫টি ওরাংওটাং মারা গিয়ে থাকতে পারে। তিনি একে 'এই প্রজাতির জন্য একটি বড় আঘাত' বলে উল্লেখ করেছিলেন। 

তবে তার সাম্প্রতিক হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৫৮-তে দাঁড়িয়েছে, যা আগের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। 

সাইক্লোনের কয়েক সপ্তাহ পর ত্রাণকর্মীরা জানান, মধ্য তাপানুলি জেলার পুলো পাক্কাত গ্রামে কাদা ও কাঠের ধ্বংসস্তূপের নিচে অর্ধেক চাপা পড়া একটি মৃতদেহ পেয়েছেন তারা। এটি একটি তাপানুলি ওরাংওটাংয়ের মৃতদেহ বলেই তাদের ধারণা। 

আরও পড়ুন

ওই এলাকায় একটি মানবিক সাহায্য দলের সঙ্গে কাজ করা ডিকি চন্দ্র বলেন, গত কয়েক দিনে আমি অনেক মানুষের মৃতদেহ দেখেছি, কিন্তু বন্য প্রাণীর মৃতদেহ এই প্রথম দেখলাম। ওরা আগে ফল খেতে এই জায়গায় আসত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা তাদের কবরস্থান হয়ে গেছে। 

মেইজার্ড জানান, তিনি চন্দ্রের পাঠানো মৃত ওরাংওটাংয়ের ছবিগুলো দেখেছেন।

তিনি বলেন, আমাকে সবচেয়ে বেশি যা নাড়া দিয়েছে তা হলো, এর মুখের সব মাংস ছিলে গিয়েছিল। যখন কয়েক হেক্টর বনভূমি বিশাল ভূমিধসে ধসে পড়ে, তখন শক্তিশালী ওরাংওটাংও অসহায় হয়ে পড়ে এবং এভাবেই পিষ্ট হয়।

তিনি আরও বলেন, ওই সময় বনের ভেতরের অবস্থা নিশ্চয়ই নরকের মতো ছিল।

বিলুপ্তির ঝুঁকি ও সংরক্ষণ

গবেষকেরা জানিয়েছেন, সাইক্লোন সেনিয়ার একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হলেও এর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে। 

তারা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে ওই এলাকায় অতি বৃষ্টির মাত্রা ও তীব্রতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা তাপানুলি ওরাংওটাং এবং তাদের আবাসস্থলের জন্য বড় হুমকি। 

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত এই প্রজাতিটি যদি প্রতিবছর তাদের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের বেশি হারাতে থাকে, তবে তারা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ইন্দোনেশিয়া সরকার সাময়িকভাবে সুমাত্রার সংরক্ষিত বনাঞ্চল বাতাং তোরু এলাকায় খনন, পাম তেলের বাগান এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বড় ধরনের উন্নয়নকাজ বন্ধ রেখেছে। এর ফলে গবেষকেরা এই প্রজাতির পরিবেশগত ঝুঁকি আরও ভালোভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছেন।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, সেনিয়ারের এই ধ্বংসযজ্ঞ প্রমাণ করে যে এই প্রজাতি কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 

তারা প্রতিবেদনে লিখেছেন, তাপানুলি ওরাংওটাং আজ যে সংকটের মুখে, তা জলবায়ু অস্থিতিশীলতা, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির এক সমন্বয়। এই হুমকি মোকাবিলায় এখন সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

টিকে থাকা ওরাংওটাংগুলোকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন বলেও তারা উল্লেখ করেন। 

তারা বলেন, দেশের ভেতরে সুরক্ষা জোরদার, জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে আমরা আধুনিক যুগে কোনো গ্রেট এপ প্রজাতির প্রথম বিলুপ্তি ঠেকাতে পারি।'

আরটিভি/এমএ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission