শেষ মুহূর্তে স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা! 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ , ০৬:১৫ পিএম


শেষ মুহূর্তে স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা! 
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে শুক্রবার (১৯ জুন) দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ সময়ে বৈঠকটি স্থগিত হওয়ায় সদ্য অর্জিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটির স্থায়ী রূপ পাওয়া এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠক স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, আলোচনা আপাতত না হলেও ভবিষ্যতে এর আয়োজনের জন্য বুর্গেনস্টকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। বৈঠক স্থগিত হওয়ার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তার সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করেছেন। হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা বেশ জটিল ছিল, তবে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে মার্কিন প্রতিনিধিদল আবারও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।

এর আগে গত বুধবার(১৭ জুন) ৪ মাসের যুদ্ধ শেষে একটি ১৪ দফা চুক্তির মাধ্যমে অন্তত ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হয়েছিল দুই দেশ। তবে নতুন করে কারিগরি আলোচনা শুরুর আগেই মার্কিন নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান। তেহরানের আলোচকদের স্পষ্ট বক্তব্য, আলোচনার টেবিলে বসার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনকে দৃশ্যমান ও বাস্তব পদক্ষেপ দেখাতে হবে।

আরও পড়ুন

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক বার্তায় দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ‘হতাশা থেকে’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘অবিশ্বস্ত’ মার্কিন পক্ষ যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানের অনেক আইনপ্রণেতাই এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, সংঘাত বন্ধের জন্য ট্রাম্প ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন। যেখানে ট্রাম্প শুরুতে ঘোষণা করেছিলেন যে ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হবে না, সেখানে চুক্তিতে ইরানকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের আটকে থাকা ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া এবং তেল রপ্তানিতে তাৎক্ষণিক মার্কিন ছাড়ের বিষয়গুলো অন্যতম।

সমালোচকেরা বলছেন, চার মাস আগে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের যে মূল লক্ষ্যগুলো ছিল—যেমন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলবিরোধী মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সমর্থন বন্ধ করা এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো—তার একটিও এই সমঝোতা স্মারকে প্রতিফলিত হয়নি। উল্টো ইরান তার ইউরেনিয়াম মজুত দেশের ভেতরেই রেখে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করতে সম্মত হয়েছে, যা ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি।

তবে এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়া এবং চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো এতে ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইসরায়েল নিজেকে এই চুক্তি থেকে দূরে রেখেছে এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান পূর্ণ শক্তিতে চালিয়ে যাচ্ছে।  শুক্রবারও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

চুক্তিতে লেবাননের যুদ্ধ ‘স্থায়ীভাবে সমাপ্ত’ করার কথা বলা হলেও ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে যে তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না, বরং নতুন মানচিত্রে তাদের দখলকৃত অঞ্চল আরও সম্প্রসারিত করেছে। এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার সম্পর্কে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য তৈরি করেছে।

এদিকে ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়ের কারণেও মার্কিন প্রশাসন এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপে রয়েছে। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ দেশটির আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে চলমান যুদ্ধের খরচ এবং অন্যান্য জরুরি বিল মেটাতে তাদের এই মুহূর্তে আরও ৮০ বিলিয়ন (৮ হাজার কোটি) ডলার প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হওয়ায় আপাতত তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এছাড়া কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও কিছুটা কমেছে। তবে ইরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং ৬০ দিনের আলোচনা শেষে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর নতুন ‘সেবা ফি’ আরোপের পরিকল্পনা করছে। ফলে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উভয় পক্ষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission