বলা হয়ে থাকে প্রেম কোনো সীমানা মানে না। তবে ভারতের গুজরাতের তরুণ প্যাটেল ও বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের মেয়ে কাজুলির (বর্তমানে কাজল) জীবনে আন্তর্জাতিক সীমান্তই এখন প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেম এবং পরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসে বিয়ে—যার জেরে এই দম্পতি এখন পড়েছেন চরম আইনি জটিলতায়। গুজরাত পুলিশের ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের চারজনের সাজানো সংসারে কোনো অশান্তি ছিল না।
চলতি বছরের ২ জুনের কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন গুজরাতের আনন্দ জেলার লাম্বভেল গ্রামের বাসিন্দা তরুণ প্যাটেল। একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ তার বাড়িতে এসেছিল সেদিন। তরুণ প্যাটেল জানান, কাজলের মা বাংলাদেশে থাকেন। মায়ের একটি অস্ত্রোপচার হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে কাজল সেদিন বাংলাদেশে ফোন করেছিলেন। মায়ের জন্য কান্নাকাটি করায় তরুণ তার নিজের মোবাইল থেকে একটি আইএসডি কল করে দেন। সেই ফোন কলটিই ট্র্যাক করে আনন্দ জেলার পুলিশ সরাসরি তরুণের বাড়িতে এসে হাজির হয়।
পুলিশ বাড়িতে এসে তরুণের ফোন পরীক্ষা করে কাজলের মায়ের নামে সেভ করা একটি নম্বর দেখতে পায়। তখন তরুণ স্বীকার করেন যে তার স্ত্রী বাংলাদেশি। এরপর কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কোনো বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসার কাগজপত্র না থাকায় তাকে আটক করা হয়। আনন্দ জেলার পুলিশ সুপার জি জি জাসানি জানান, কাজল যে গুজরাতে অবৈধভাবে বাস করছেন তা প্রমাণিত। বাংলাদেশ থেকে গুজরাতে আসার সময় তার কাছে পাসপোর্ট বা বৈধ কোনো ভ্রমণের প্রমাণ ছিল না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের মেয়ে কাজুলির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তরুণের। তাদের বন্ধুত্ব পরে প্রেমে পরিণত হলে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তরুণ তাকে পাসপোর্ট তৈরি করে গুজরাতে চলে আসতে বলেছিলেন। তবে কাজুলির পরিবার তাকে বাংলাদেশের এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। কাজুলি পাসপোর্টের জন্য একজন দালালকে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হন। অবশেষে পারিবারিক চাপের মুখে তিনি ঘর ছেড়ে পালিয়ে প্রথমে কলকাতায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে গুজরাতের আনন্দে চলে আসেন। সেখানে তারা মালা বদল করে বিয়ে করেন এবং কাজুলি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘কাজল’ রাখেন। তবে সেই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনা সম্ভব না হওয়ায় তাদের বিয়েটি আইনতভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। মুসলিম ধর্মাবলম্বী কাজল বিয়ের পর হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন।
কাজল গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তরুণ ও তার পরিবার মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কাজল বর্তমানে আনন্দের ‘জাগ্রুতি মহিলা সংগঠন’ নামে একটি নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে রয়েছেন। তরুণ প্যাটেল বলেন, ‘আমার দুই সন্তান প্রতিদিন মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। তাকে যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে আমাদের পরিবারটি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।’ কাজলের শাশুড়ি ইন্দুবেন বলেন, ‘কাজল চলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারের কেউই ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। কাজল আমার কাছে কেবল পুত্রবধূ ছিল না, ছিল আমার নিজের মেয়ের মতো।’
হোমের সভানেত্রী আশা দালাল জানান, কাজল সবসময় চরম মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন এবং প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। তার একমাত্র ভয়, যদি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তিনি আর কখনোই তার সন্তানদের কাছে ফিরে আসতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে মাঝেমধ্যে তাকে দূর থেকে সন্তানদের দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে তরুণের একমাত্র লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো থেকে আটকানো। এই জন্য তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার আইনজীবী জয়নব সাইয়েদ বলেন, ‘আমরা আদালতে গিয়ে চেষ্টা করব আইনের মারফত কাজল যাতে ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে, যা ভারতে বসবাসকারী যে কারোর জন্যই প্রযোজ্য। কেউ যদি কোনো ভারতীয়কে বিয়ে করে দীর্ঘ বছর তার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন।’
এ ছাড়া তরুণ প্যাটেল স্থানীয় সংসদ সদস্য মিতেশ প্যাটেলের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন। মিতেশ প্যাটেল জানিয়েছেন, তিনি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে এই মানবিক বিষয়টি তুলে ধরবেন।
গুজরাত পুলিশ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ নামে এই বিশেষ অভিযান শুরু করে। ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই অভিযানের আওতায় ৩৬২ জন কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ১০৩ জন পুরুষ, ১৮৮ জন নারী এবং ৭১ জন শিশু রয়েছে। প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে পুলিশ স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে, যারা অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার ও ভুয়া নথিপত্র সরবরাহের সঙ্গে জড়িত।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরটিভি/এআর




