চীনের বাঁধ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারত-বাংলাদেশের জন্য ‘টাইম বোমা’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ 

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ০৪:৩১ পিএম


চীনের বাঁধ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারত-বাংলাদেশের জন্য ‘টাইম বোমা’
ছবি : সংগৃহীত

চীনের এক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় উঠে এসেছে, তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো ( ব্রহ্মপুত্র ) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঠিক তলদেশে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি বা ফল্ট লাইনের অস্তিত্ব রয়েছে।

ভূতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, হিমালয় অঞ্চলের এই ফল্ট লাইনটি নির্মাণাধীন মেগা বাঁধের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

হংকং-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে’-র তত্ত্বাবধানে মান্দারিন ভাষায় প্রকাশিত ‘সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি’ সাময়িকীতে গত মাসে এই গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের চীনা ভূতাত্ত্বিকদের একটি যৌথ দল গবেষণাটি পরিচালনা করেছে।

গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘পাইঝেন ফল্ট’ নামের এই ভূগর্ভস্থ ফাটলটি প্লাইস্টোসিন বা বরফ যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সক্রিয়। এই সক্রিয়তার কারণে এটি মেদগ কাউন্টির এই মেগা বাঁধ, সংযোগকারী সড়ক, সেতু, টানেল এবং সামগ্রিক কৃত্রিম জলাধারের কাঠামোর ওপর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এই চ্যুতিটি চারপাশের শিলাখণ্ডগুলোকে পুরোপুরি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে, যার ফলে মাটির ভেতরের স্তরগুলোর ধারণক্ষমতা ও দৃঢ়তা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে এই ভঙ্গুর ভিত্তিটি ৬০ হাজার মেগাওয়াটের একটি দানবীয় বাঁধ এবং এর পেছনে জমা থাকা কোটি কোটি গ্যালন পানির ওজন ধরে রাখতে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।

গবেষণা প্রতিনিধি দলটি আরও সতর্ক করেছে, তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি আলগা এবং এর মাটির কণার ভেতরের বন্ধনও খুব দুর্বল। একবার যখন এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানি পূর্ণ করা হবে, তখন দীর্ঘস্থায়ী জলীয় সম্পৃক্ততা, ফল্ট লাইনের অবিরত কম্পন এবং ভূমিকম্পের সম্মিলিত প্রভাবে জলাধারের দুই পাশের পাহাড়ে প্রলয়ংকরী ভূমিধস ঘটবে। এই ধরনের ধস সরাসরি বাঁধের মূল পরিকাঠামো ও সেখানে কর্মরত কর্মীদের জীবনকে চরম বিপন্ন করে তুলবে।

তিব্বতে গত বছর থেকে এই মেগা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে চীনের বর্তমান বিখ্যাত থ্রি গর্জেস বাঁধের চেয়েও তিন গুণ বড় এবং এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা।

আরও পড়ুন

ইয়ারলুং সাংপো নদীটি তিব্বত ছেড়ে ভারতের অরুণাচল ও আসামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নদী নামে প্রবেশ করেছে। ফলে ব্রহ্মপুত্রের ভাটিতে থাকা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এই মেগা বাঁধটি এখন একটি ‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

চীনা বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা উদ্বেগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছেন, এই বাঁধটি যেখানে নির্মিত হচ্ছে, সেই এলাকাটি মূলত হিমালয় সিসমিক বেল্ট বা ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত। এখানে চীন ও তার আশপাশের অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের বলয় তৈরি হয়েছে।

গবেষকেরা কোয়াটারনারি যুগের (২৫.৮ লাখ বছর আগে থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত) টেকটোনিক নড়াচড়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এই পাইঝেন চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন যুগের শুরুতে সৃষ্টি হলেও বর্তমান হলোসিন যুগেও এটি তার সক্রিয়তা বজায় রেখেছে।

এ ছাড়া প্রাচীন হ্রদের তলানির কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাত্র ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও ফাটলটি সক্রিয় ছিল।

গবেষকরা এর আধুনিক ভূকম্পন সম্ভাবনার প্রমাণ হিসেবে ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিনে সংঘটিত ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পটির কথাও উল্লেখ করেছেন, যা ফল্ট লাইনটির উত্তর প্রান্তে ঘটেছিল।

তারা বলেন, ‘আঞ্চলিক ভূমিকম্পের প্রভাবে সহজেই ভূমিধস ও ধস ঘটতে পারে, যা প্রকৌশল স্থাপনা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি’। 

তাই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো সময় এই অঞ্চলে মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা তাসের ঘরের মতো বাঁধটিকে গুঁড়িয়ে দেবে এবং এর ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও ভূমিধস পুরো হিমালয় অঞ্চলসহ ভাটির বিস্তীর্ণ জনপদকে মাটির নিচে চিরতরে চাপা দিয়ে দিতে পারে।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission