টোকিওতে ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ঘুম মাত্র ৩ ঘণ্টা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ 

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬ , ০৫:২৭ পিএম


টোকিওতে ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ঘুম মাত্র ৩ ঘণ্টা
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ছবি: সংগৃহীত

কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে যখন সরকারি কর্মীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে, তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুম ও কাজের অভ্যাস নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রাতে সাধারণত শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। দেশটির দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি বদলানোর প্রচেষ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ।

২০২৫ সালের অক্টোবরে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তাকাইচি। সম্প্রতি ‘সি ডে’ নামের একটি সরকারি ছুটিতে নিজের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন তিনি। সেখানে জানান, বহুদিন পর ওই দিন টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোই তার নিয়মিত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফরচুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকাইচির ওই পোস্টটি তিন কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। পোস্টে তিনি জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি সপ্তাহান্তও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বসে আইন ও নীতিসংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক নথি পড়েই কাটিয়েছেন।

ছুটির দিনে কিছুটা বেশি ঘুমানোর পাশাপাশি জমে থাকা ঘরের কাজও করেন বলে জানিয়েছেন তাকাইচি। কাপড় ইস্ত্রি করা থেকে শুরু করে পোশাকের ছেঁড়া অংশ সেলাই করার কথাও লিখেছেন তিনি। পরদিন থেকে আবার পূর্ণ উদ্যমে কাজে ফেরার প্রত্যয় জানিয়ে পোস্টটি শেষ করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।

তবে দীর্ঘ সময় কাজ করা এবং খুব অল্প ঘুমানোর বিষয়টি তাকাইচির জন্য নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় সহকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, নিজের ক্ষেত্রে ‘কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য’ শব্দটি বাদ দিতে চান। একই বক্তব্যে তিনি একাধিকবার ‘কাজ’ শব্দটি ব্যবহার করে নতুন সরকারকে কঠোর পরিশ্রমের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর ভোর তিনটায় কর্মকর্তাদের বৈঠকে ডাকার ঘটনায়ও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তাকাইচি। পরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, বাসার ফ্যাক্সযন্ত্র নষ্ট থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখতে তাকে কর্মকর্তাদের সহায়তা নিতে হয়েছিল। সকালে একটি বৈঠকের প্রস্তুতির জন্যই এত ভোরে তাদের ডাকা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা তোরু কুনিশিগে সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি মানুষের বিচারবুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেশের নিরাপত্তা বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের এমন জীবনযাপন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও মত দেন তিনি। আরেক রাজনীতিক মন্তব্য করেছেন, যথাযথ বিশ্রাম নেওয়াও একজন নেতার দায়িত্বের অংশ। 

তাকাইচির কাজের রুটিন নিয়ে বিতর্কটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জাপানের সামাজিক বাস্তবতার কারণে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং চাকরিজনিত মানসিক চাপ দেশটিতে বহু বছর ধরে গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুকে জাপানি ভাষায় ‘কারোশি’ বলা হয়। কর্মক্ষেত্রের চাপ কমাতে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নমনীয় কর্মঘণ্টা, বাধ্যতামূলক ছুটি এবং দূর থেকে কাজ করার মতো ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে।

এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে টোকিও মহানগর সরকার ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে যোগ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন কাজ করার সুযোগ চালু করে। ব্যবস্থাটির লক্ষ্য ছিল কর্মীদের পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ বাড়ানো, সন্তান লালন-পালনে সহায়তা করা এবং বিশেষ করে নারীদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কমানো। টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কোইকে বলেছিলেন, নারী ও পুরুষ উভয়েই যাতে নিজেদের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের ধরন বেছে নিতে পারেন, সে জন্য নমনীয় কর্মব্যবস্থা জরুরি। 

জাপানের নিম্ন জন্মহারও চার দিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সন্তান পালনের ব্যয় এবং পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারাকে দেশটির জনসংখ্যা সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। ফলে টোকিওর উদ্যোগটি শুধু কর্মীদের সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; পরিবারবান্ধব সমাজ গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এর আগে ২০১৯ সালে মাইক্রোসফট জাপান পরীক্ষামূলকভাবে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, পরীক্ষার সময় কর্মীদের উৎপাদনশীলতা আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছিল। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও কাগজের ব্যবহার কমে এবং কর্মীদের সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। তবে সব শিল্প ও পেশায় একই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। 

তাকাইচির বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণ কর্মীরা চাকরি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেতন ও পদমর্যাদার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য পর্যাপ্ত সময়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে একজন সরকারপ্রধানের অতিরিক্ত কাজকে গৌরবের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্কৃতির প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাকাইচির ঘুমের সময়সূচি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে তার বক্তব্য দেশটিতে একটি পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে—দীর্ঘ সময় কাজ করাই কি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়, নাকি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে সুস্থভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই একজন সরকারপ্রধানের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

টোকিওর চার দিনের কর্মসপ্তাহ কর্মীদের কম সময় কাজ করে আরও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ দিচ্ছে। বিপরীতে, দেশের সরকারপ্রধানের শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাস জাপানের পরিবর্তনশীল কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission