আফ্রিকার ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘ খরার কারণে এবার বিপদের মুখে পড়েছে মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী উট। এক সময় প্রচণ্ড গরম ও পানির অভাব সহজেই সহ্য করতে পারলেও এখন অতিরিক্ত তাপমাত্রার কাছে টিকতে পারছে না এই প্রাণী। এতে উটের মৃত্যু বাড়ছে, কমে যাচ্ছে দুধ উৎপাদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রজনন ক্ষমতাও।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আফার অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকা। সেখানে উট পালনকারী আলি উমের জানান, অতিরিক্ত গরমে তার উটগুলোর পায়ে ফোস্কা পড়ছে, চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, গরম বালুতে চামড়া পুড়ে যাচ্ছে এবং লোম ঝরে পড়ছে। গত এক মাসেই তিনি আটটি উটশাবক হারিয়েছেন।
তার ভাষায়, আগে বাতাস কিছুটা স্বস্তি দিত, এখন সেই বাতাসও গরম হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রার এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
গবেষক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে উটের মধ্যে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, নানা রোগ এবং শারীরিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে খরা, পানির সংকট, গাছপালা কমে যাওয়া এবং ছায়ার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
দুই কুঁজের বদলে এক কুঁজবিশিষ্ট উটের সবচেয়ে বড় সংখ্যা উত্তর আফ্রিকা ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলজুড়ে রয়েছে। এসব এলাকায় গবাদিপশুর বদলে উট পালনের প্রবণতা বাড়লেও এখন সেই উটই জলবায়ু পরিবর্তনের বড় শিকার হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি ইথিওপিয়ায় উট পালনকারীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে উটের স্বাস্থ্য, দুধ উৎপাদন এবং বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাশের দেশ সোমালিয়াতেও একই চিত্র। প্রায় ছয় হাজার পরিবার নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, খরার কারণে প্রায় অর্ধেক উট পালনকারী পরিবার উট হারিয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় মৃত্যুর হার ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
কেনিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাণিচিকিৎসক হাসান নুয়া গুইয়ো জানান, গত দুই বছরে অতিরিক্ত গরমের কারণে তার এলাকায় উটের মৃত্যু ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে অসুস্থ উটের সংখ্যাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উট সহ্য করতে পারে। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হচ্ছে। এতে উটের শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য গ্রহণও কমে যাচ্ছে।
গবেষকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত গরমের কারণে উটের ওজন কমে যাচ্ছে, কিডনির সমস্যা, পেশি ও হাড়ের রোগ এবং পরজীবীজনিত সংক্রমণও বাড়ছে। ফলে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রজননেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকায় গত কয়েক দশকে তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। আর ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর আফ্রিকাই সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, অনেক উট পালনকারী এখন উত্তরাঞ্চল ছেড়ে তুলনামূলক শীতল ও সবুজ দক্ষিণাঞ্চলে স্থায়ীভাবে চলে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী উটও ভবিষ্যতে টিকে থাকার বড় সংকটে পড়বে।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ




