চোখে একটুখানি কাজল ছোঁয়ালেই চেহারায় ফুটে ওঠে ভিন্ন এক আভিজাত্য। এই ছোট্ট কালো রেখাটি কেবল সাজগোজের অনুষঙ্গ নয় বরং এর সঙ্গে মিশে আছে আমাদের মা, দাদি কিংবা কয়েক হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি।
কাজল মূলত ইতিহাস, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির এক নীরব ভাষা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। এশিয়া, আফ্রিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত সভ্যতায় কাজল কেবল সৌন্দর্যের উপকরণ ছিল না বরং এটি কাজ করেছে সুরক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে। এই ঐতিহ্যের গভীরতা বিবেচনা করে ২০২৩ সালে ইউনেসকো আরব অঞ্চলের কাজল ব্যবহারের ঐতিহ্যকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে।
কাজলের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও পারস্য সভ্যতায়। প্রাচীন মিশরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাজল ব্যবহার করত যা কেবল রোগ থেকে চোখকে বাঁচাত না বরং অশুভ শক্তি থেকেও সুরক্ষা দিত বলে তারা বিশ্বাস করত। এমনকি মিশরের রানী নেফারতিতির সেই জাদুকরী চোখ আজও সারা বিশ্বের মেকআপ প্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ১৯১২ সালে নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি আবিষ্কারের পর তার চোখের গাঢ় কাজল নতুন করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যা আধুনিক আইলাইনারের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।
আইলাইনার বা কাজলের ব্যবহার অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও এর মূল উদ্দেশ্য প্রায় সব জায়গায় এক—সুরক্ষা। জাপানের গেইশা শিল্পীরা শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন আবার জর্ডানের বেদুইন পুরুষরা সূর্যের প্রখর তাপ থেকে বাঁচতে চোখে কাজল পরেন। মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে এটি প্রতিবাদের ভাষা এবং আফ্রিকার যাযাবর গোষ্ঠী চাদদের কাছে এটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার প্রধান অস্ত্র। বাংলাদেশেও নবজাতকের কপালে বা চোখে কাজল দেওয়ার প্রচলনটি মূলত সুরক্ষার এক আদিম বিশ্বাস থেকেই চলে আসছে।
ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক জাহরা হানকিরের মতে কাজল লাগানো কেবল চোখে দাগ টানা নয় বরং এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এটি বিশ্বের সেই জনগোষ্ঠীগুলোকে সম্মান জানায় যারা যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও নিজেদের শিকড় ও পরিচয়কে ধরে রেখেছে। যখন একজন নারী আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল পরেন তখন তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কয়েক হাজার বছরের এক দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। কাজল তাই কেবল প্রসাধন সামগ্রী নয় বরং এটি নিজের ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী ডিজিটাল বা এনালগ সাক্ষর হিসেবে টিকে আছে।
সূত্র: বিবিসি





