পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়, এটি সম্পর্ক মজবুত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বর্তমানে সেই পারিবারিক মুহূর্তে জায়গা করে নিচ্ছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশনসহ নানা ধরনের যন্ত্র। ফলে একই টেবিলে বসেও অনেক পরিবার একে ওপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সময় শিশুদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মায়েরাই বেশি যন্ত্র ব্যবহার করেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩৫০ জনের বেশি অভিভাবকের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, পরিবারের শেষ একসঙ্গে খাওয়ার সময় কোনো না কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে মোবাইল ফোন।
শুধু বাবা-মা নয়, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশও খাবারের সময় কোনো না কোনো যন্ত্র ব্যবহার করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সিসিলিয়া সাদা গারিবে বলেন, বর্তমানে যন্ত্রের ব্যবহার আমাদের জীবনে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে অনেক সময় আমরা বুঝতেও পারি না এটি সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলছে। খাবারের টেবিলে বসে বারবার ফোন দেখা সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের মূল্যবান সময় কমিয়ে দিতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জামা পেডিয়াট্রিকসে’।
একসঙ্গে খাওয়ার উপকারিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেলে শুধু খাবারের মান ভালো হয় না, মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়। নিয়মিত পারিবারিক খাবারের অভ্যাস শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আবেগ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি করে এবং পরিবারের বন্ধন শক্ত করে।
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিভাগের অধ্যাপক মার্গি স্কিয়ার বলেন, পারিবারিক খাবারের আসল উপকার খাবারের মধ্যে নয়, বরং একে অপরের সঙ্গে কথা বলা ও অনুভূতি ভাগ করার সুযোগে।
তার মতে, ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো শিশুদের মনে এই অনুভূতি তৈরি করে যে তারা পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল কেন কমাচ্ছে পরিবারের সংযোগ?
গবেষকদের মতে, সব ধরনের যন্ত্র ব্যবহার একই রকম নয়। পরিবারের সবাই মিলে কোনো অনুষ্ঠান দেখা বা একসঙ্গে কিছু উপভোগ করা সম্পর্ক বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকে আলাদা আলাদা মোবাইল ব্যবহার করলে একই জায়গায় থেকেও সবাই আলাদা জগতে চলে যায়।
সিসিলিয়া সাদা গারিবে বলেন, আগে পরিবারের সবাই মিলে কোনো কিছু দেখা ছিল একটি যৌথ অভিজ্ঞতা। এখন সেই জায়গা দখল করছে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহার।
ফলে খাবারের টেবিলে বসেও বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে কথা বলা, হাসি-আনন্দ ভাগ করার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
ব্যস্ত জীবনেও কীভাবে ফিরবে পারিবারিক সময়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন বড় আয়োজন করে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে খাওয়ানো সম্ভব না হলেও ছোট ছোট কিছু অভ্যাস সম্পর্ককে শক্ত করতে পারে।
একসঙ্গে বসে মাত্র পাঁচ মিনিট গল্প করাও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সন্তানের সঙ্গে তার দিন কেমন গেল, কী ভাবছে—এসব জানতে চাওয়াও সম্পর্ক গভীর করে।
পরিবারের খাবারের সময় অন্তত সপ্তাহে একদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিটের জন্য মোবাইল দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক অ্যান ফিশেল বলেন, নিয়মিত একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস পরিবারের মধ্যে নিরাপত্তা, পরিচয় ও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করে।
ফোন নয়, হোক পরিবারের সঙ্গে সময়
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সবসময় সম্ভব নয়। তবে পরিবারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ফোনের ব্যবহার কমিয়ে একে অপরের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
কারণ পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তই ভবিষ্যতে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি তৈরি করে।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ



