দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শুধু মনের ওপর নয়, সরাসরি প্রভাব ফেলে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
অনেকেই লক্ষ্য করেন যে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সময় হয় তাদের খুব বেশি চকোলেট, পিৎজা বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে, অথবা ক্ষুধা একেবারেই মরে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোন এবং স্নায়বিক পরিবর্তনের এক জটিল প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্ট্রেস সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা রাজিতা সিন্হা জানান, যখন মানুষ কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে অসহায় বোধ করে, তখন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অংশটি শরীরের কোষে সংকেত পাঠিয়ে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়।
স্বল্পমেয়াদী স্ট্রেস বিপদ মোকাবিলায় সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদী বা ‘ক্রনিক স্ট্রেস’ শরীরের জন্য মারাত্মক হতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থেকে ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা এবং ওজন বৃদ্ধির মতো জটিলতা দেখা দেয়।
মানসিক চাপের সময় কেন খিদে বাড়ে বা কমে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিউরো-অপথালমোলজিস্ট মিঠু স্টোরোনি। তার মতে, মানুষের পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। মানসিক চাপ ভেগাস নার্ভের কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা পেট ভরা থাকার সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায়। এর ফলে কারো কারো খিদে কমে যায়।
আবার বিপরীত দিকে, স্ট্রেসের সময় মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ চিনির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। শরীর তখন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য শক্তির জোগান দিতে চিনি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রেস শরীরের ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এটি ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে। যাদের শরীরে মেদ বেশি, তাদের ইনসুলিন প্রতিরোধের সম্ভাবনাও বেশি থাকে, ফলে স্ট্রেসের সময় তাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি চিনি দাবি করে।
রাজিতা সিন্হা একে একটি ‘দুষ্টচক্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দিয়েছেন। ডা. স্টোরোনির মতে, পর্যাপ্ত ঘুম স্ট্রেস ইটিং নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার। ঘুম মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলোকে রিসেট করে হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।
এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম শরীরকে শিথিল করতে সাহায্য করে। খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনাও জরুরি। অতিরিক্ত শর্করাযুক্ত খাবার বা জাঙ্ক ফুড কেনা বন্ধ করতে হবে যেন তা হাতের নাগালে না থাকে।
এর বদলে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ, মাংস, মটরশুঁটি এবং স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট হিসেবে ওটস বা মসুর ডাল বেছে নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে অ্যালকোহল পরিহার এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সবার সঙ্গে মিলেমিশে রান্না করা বা খাওয়া-দাওয়া মানসিক চাপ কমিয়ে খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আরটিভি/এএইচ





