বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ , ১০:৫৭ এএম


বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা
প্রতীকী ছবি (এআই)

দেশে দ্রুত বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা। সহজলভ্য ও কম খরচের এই বাহন একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তা এখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ চুরির ঝুঁকি।

গভীর রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশায় চার্জ দেওয়া হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। আর এর ফলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উধাও হচ্ছে বলে জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। প্রতিবার পূর্ণ চার্জ দিতে গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ লাগে, যা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট বিদ্যুৎ খরচের সমান। এতে একটি রিকশা টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা চলতে পারে।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন এসব যান চার্জ দিতে জাতীয় গ্রিড থেকে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হওয়ার কথা। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর বড় একটি অংশই বৈধভাবে হিসাবভুক্ত হচ্ছে না। প্রায় ৮০ শতাংশ গ্যারেজে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে এসব রিকশা চার্জ দেওয়া হয়, ফলে সরকার প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের রাজস্ব হারাচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ চালক গ্যারেজে রাতভর রিকশা রেখে চার্জ করান। এ জন্য গ্যারেজ মালিককে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দিতে হয়। এসব চার্জিং পয়েন্টের বেশিরভাগই অনুমোদনহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত, যেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ আসে অবৈধ লাইনের মাধ্যমে। এতে বিপণন সংস্থাগুলো বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান চালালেও গ্যারেজ মালিকদের নানা কৌশলে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কিছু এলাকায় আলাদা ট্যারিফ চালু করা হয়েছে, যার আওতায় সীমিতসংখ্যক রিকশা বৈধভাবে বিদ্যুৎ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড এমনিতেই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশার অতিরিক্ত চার্জিং চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে, তখন এসব রিকশা চার্জিং লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন দিলেও ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬২ লাখ, যার মধ্যে বাস-মিনিবাস মাত্র ৮৪ হাজার। তিন চাকার যানবাহনের মধ্যে শুধু অটোরিকশা ও অটোটেম্পোর নিবন্ধন দেওয়া হয়, যার বৈধ সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে নিবন্ধনের বাইরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ ছোট তিন চাকার যান চলাচল করছে, যেগুলোকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি পরিবারের জীবিকার উৎস। একজন চালকের পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা পাঁচজন ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবনযাপন এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া রিকশা মেরামত, ব্যাটারি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট কারখানায়ও বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই বাহন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, শুরুতেই এসব তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরিস্থিতি ভালো থাকত। এখন বিপুলসংখ্যক ত্রুটিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত যান সড়কে চলাচল করছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে সঠিক নীতিমালা, নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রিত চার্জিং স্টেশন চালু করা জরুরি। তা না হলে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি— দুটোই ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission