১৬ মাসে দেশে ঢুকেছে দেড় লাখ রোহিঙ্গা

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ , ০৩:১৬ এএম


১৬ মাসে দেশে ঢুকেছে  দেড় লাখ রোহিঙ্গা
লাগাতার অনুপ্রবেশে ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি ধেয়ে আসছে বড় মানবিক বিপর্যয়। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজারে নতুন অনুপ্রবেশ ও ক্যাম্পে উচ্চ জন্মহারের কারণে রোহিঙ্গাসংকট দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শুধু ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনেই নতুন করে দেড় লাখ অনুপ্রবেশের কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে শতাধিক শিশু।

১৩ মে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ১৬ মাসে নতুন করে দেড় লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। মাসিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন রোহিঙ্গা নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে গত মাসে ২ হাজার ৭৮০ জন নতুন আগত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, প্রায় ২৮ লাখ জনসংখ্যার এ জেলায় এখন অতিরিক্ত প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে হচ্ছে। মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ হলেও সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা তার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত এ জনসংখ্যার চাপ স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নতুন করে আগতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু হওয়ায় মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার মাত্রাও বাড়ছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪-তে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার বেশি। তথ্যানুযায়ী, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯৯০ সাল থেকে বাস্তুচ্যুত মোট ১০ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৪ রোহিঙ্গাকে নিবন্ধন করেছে ইউএনএইচসিআর। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছেন, ক্যাম্পের ভিতরে ও বাইরে মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। এর মধ্যে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ এবং মোট পরিবারসংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। 

জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোহিঙ্গার মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ প্রবীণ। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে ৪৯ শতাংশ পুরুষ ও ৫১ শতাংশ নারী। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ শিশু জন্ম নিচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হওয়ায় সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষাসংকট, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামো, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা এসব কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মহার অস্বাভাবিক বেশি। ফলে সরকারের ‘দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো হয়’ নীতির কার্যকর প্রয়োগ সেখানে সম্ভব হচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যার ভরণপোষণ, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে চরম চাপে পড়েছে সরকার ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো। 

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে ২০২৫-২৬ সালের জেআরপি (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) বাস্তবায়নে ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি মাত্র ২১ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষাকার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়বে। এর মধ্যে ৬৩ হাজার নতুন আগমনকারী শিশুও রয়েছে। ১১ মে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এনজিও প্রতিনিধিদের মোর্চার (সিসিএনএফ) কো-চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলা ও প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন গঠন জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকায় প্রতিনিয়ত নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এবং এটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করবে।’ 

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে ইতোমধ্যে কক্সবাজারের প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক নিচে নেমে যাচ্ছে। বন ও পাহাড় উজাড়ের কারণে বন্যহাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণও সীমিত হয়ে পড়েছে।


আরটিভি/কেডি

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission