পাইকারি পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি কমাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত (১৭-২১ শতাংশ) বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। পাশাপাশি উচ্চ ভোল্টেজের কিছু গ্রাহক শ্রেণিকে নিজেদের মধ্যে এনে খরচ কমিয়ে ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (২০ মে) সকালে রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি দেড় টাকা বা ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পিডিবি।
শুনানিতে চলতি অর্থবছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা ও আগামী অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা তুলে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, দাম না বাড়ালে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বিদ্যুৎ খাত।
তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ অংশীজনরা।
পিডিবির প্রস্তাবিত বৃদ্ধি অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় পাইকারি দাম হবে–৮ টাকা ২৪ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৫৪ পয়সা। বর্তমানে পাইকারি ইউনিট প্রতি গড় মূল্যহার ৭ টাকা ০৪ পয়সা।
অন্যদিকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গণভোগান্তিসহ শিল্পকারখানার উৎপাদন ও অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়বে বলে জানিয়েছে ভোক্তা ও সংশ্লিষ্টজনেরা। এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে ভোক্তাপর্যায় থেকে।
পিজিসিবির বর্তমান গড় সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ৩০৯৬ টাকা থেকে ১৮ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট শূন্য দশমিক ৪৯৫৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে পিজিসিবি। কমিশনের কারিগরি কমিটি প্রতি ইউনিটে ১৩ পয়সা দাম বাড়িয়ে ইউনিট প্রতি সঞ্চালন চার্জ শূন্য দশমিক ৪৪৮১ টাকা করার সুপারিশ করেছে।
এ দিন পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শুনানিতে অংশ নিয়ে পাইকারি বিদ্যুতে ৩ শতাংশ সিস্টেম লস বিবেচনায় আনার দাবি জানান। পাশাপাশি বিদ্যমান ৪ শতাংশ হারে উৎস কর মওকুফ করেও ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমিয়ে আনা যায় বলে প্রস্তাব দেন।
এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও আর দাম সমন্বয় করা হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতে লুণ্ঠনমূলক ও দুর্নীতির সহায়ক প্রকল্প গ্রহণ ও সিস্টেম লসের নামে কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণে অব্যাহতভাবে দাম বাড়ছে এবং এর দায় ভোক্তাদের ওপর চাপাতে নামমাত্র গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে বলে ভোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ।
সেই প্রেক্ষিতে এ দিনের গণশুনানিতে অংশ নেননি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম।
তবে তার পক্ষে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান শুনানিতে অংশ নিয়ে মূল্যবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশি বেআইনি কাজ করা হয়েছে এবং এতে বিইআরসি সহায়তা করেছে। এখনো কমিশনের সতর্ক হওয়ার সময় আছে। বিইআরসিকে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাই মূল্যবৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিপিডিবির মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশে জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। এ জন্য এই গণশুনানি বাতিল করতে হবে।
এ ছাড়াও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ অংশীজনরা।
তারা বলেন, লুটপাটের দায় চাপানো হচ্ছে গ্রাহকের কাঁধে। তাই উল্টো দাম কমাতে শুনানি করার দাবি তুলেন অংশীজনরা।
শুনানিতে অংশীজনরা বলেন, নিত্যপণ্যের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে বহুমুখী। উৎপাদন খাতেও পিছিয়ে পড়বেন উদ্যোক্তারা।
বৃহস্পতিবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর গণশুনানি করবে বিইআরসি।
আরটিভি/এসআর



