জিয়া স্মৃতি জাদুঘর: মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক

আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬ , ০৪:৪৫ পিএম


জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাজনৈতিক চেতনার ধারক ও বাহক
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর। ছবি : বাসস

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ধারণ করে থাকা ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ আজও এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

দেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী জিয়াউর রহমানের রক্তমাখা স্মারক, ব্যবহৃত সামগ্রী ও বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্তমানে অযত্ন-অবহেলায় ধুলোয় আচ্ছন্ন হয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

তবে এই জাদুঘরটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার অনুসারী, ভক্ত ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য আদর্শচর্চা এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত নোট, ১৯ দফা কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র মূলনীতি সম্পর্কিত নানা দলিল, যা নতুন প্রজন্মকে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

দর্শনার্থীরা এখানে এসে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত সাধারণ খাদ্যতালিকা, নিজ হাতে লেখা রাজনৈতিক নোট, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্ত করা মতামত এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বিস্মিত হন। এসব থেকে নতুন প্রজন্ম ও রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁর জীবনদর্শন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন।

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরও অন্যতম জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রনায়কের নামে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র স্টেডিয়াম-কাজীর দেউড়ি এলাকায় অবস্থিত। প্রায় ৩ দশমিক ১৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্যাগোডা ধাঁচের স্থাপত্যশৈলীর প্রতীক হিসেবে নির্মিত ভবনটিতে একই সঙ্গে স্থানীয় বহুস্তরবিশিষ্ট টিনশেড ঘরবাড়ির নকশারও সাদৃশ্য রয়েছে। চারপাশের সবুজে ঘেরা এই স্থানটি নগরবাসীর কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এই ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে এটিকে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেখানে পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য নিরীহ বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভবনটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক নীরব সাক্ষী।

স্বাধীনতার পর থেকে এটি সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কিছু উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্যদের হাতে এখানেই নির্মমভাবে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই পুরনো সার্কিট হাউসটিকেই জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিজস্ব স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলীর কারণেও এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।

দীর্ঘ সাড়ে আট বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। 

তিনি ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন করেন।

আরও পড়ুন

জাদুঘরে সংরক্ষিত জিয়ার হাতে লেখা নোটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো; ‘শুধু রাজনৈতিক দর্শনই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে অবশ্যই একটি আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি থাকতে হবে’; ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে হতে হবে বহির্বিশ্বমুখী’; ‘আমি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জন্য যুদ্ধ করেছি’; ‘দল হবে জনগণভিত্তিক’ এবং ‘দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা উচিত নয়’। রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের উদ্দেশে দেওয়া এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং কৃষি বিপ্লবের মূল রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেছিলেন।

যে দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি বা ভিআইপিদের ভোগবিলাস ও অর্থ অপচয়ের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত, সেখানে একজন রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত সাদামাটা খাদ্যতালিকা যে কাউকেই বিস্মিত করে। ১৯৮১ সালের ২৯ মে থেকে ৩০ মে সকাল পর্যন্ত এই সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্য নির্ধারিত চূড়ান্ত খাদ্যতালিকাটি তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখিতভাবে পাঠিয়েছিলেন।

তালিকা অনুযায়ী দুপুরের খাবারে ছিল দুধ-চিনিসহ চা, পাউরুটি, মাখন, ভাজা মাছ ও চিপস, রোস্ট চিকেন, সবজি, ফ্রুট ককটেল এবং লেবু। রাতের খাবারে ছিল সাদা ভাত, চিকেন স্যুপ, পুডিং, মুরগির মাংস, মাটন দোপেঁয়াজা, ডাল ও সালাদ। এছাড়া বিকেলের নাশতায় ছিল দুধ-চিনিসহ ইস্পাহানী চা, হক ব্র্যান্ডের লবণযুক্ত বিস্কুট এবং লেবু।

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতির স্মৃতিচিহ্নই নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বমোট ৮৭৬টি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাইক্রোফোন ও টেবিলের প্রতিরূপ (যেখান থেকে তৎকালীন মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন), সাত বীরশ্রেষ্ঠ ও সেক্টর কমান্ডারদের ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত পুরোনো মডেলের রাইফেল, ১৯৭১ সালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল স্মরণে মেজর জিয়ার ডাকঘর উদ্বোধনের প্রতিরূপ, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, জেড ফোর্সের লেটারপ্যাড ও খাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মনোগ্রাম এবং মেজর জিয়ার সামরিক পোশাক।

জাদুঘরের এক কর্মকর্তা জানান, ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে বড় জাদুঘরই নয়, এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

সম্প্রতি জাদুঘরটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এর মূল ভবনটি বর্তমানে চরম অবহেলায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল এবং ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কাঠের সিঁড়ি ও জানালাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণ ও ধাতব পদক, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি, যেখান থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল ও অনিশ্চিত সময়ে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান দু’দফা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই কালো রাতে ব্যবহৃত ভিআইপি কক্ষের আসবাবপত্র, রক্তমাখা ম্যাট, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড়ি ঢালে তাঁর প্রথম কবরস্থান থেকে মরদেহ ঢাকায় নেওয়ার স্ট্রেচার, খাল খনন কর্মসূচিতে তাঁর বিখ্যাত বসার ভঙ্গির প্রতিরূপসহ অনেক নিদর্শনে মরিচা ধরেছে বা বিবর্ণ হয়ে গেছে। ভবনের দেয়ালেও ফাটল দেখা দিয়েছে। 

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাদুঘরের এক কর্মী বাসস’কে বলেন, ‘সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বিগত সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ ছিল না। এ কারণেই বর্তমানে জাদুঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের একটি প্রভাবশালী মহল শহীদ রাষ্ট্রপতির স্মৃতি মুছে ফেলতে জাদুঘরটি বিলীন করার চেষ্টাও চালিয়েছিল।’

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২০ মার্চ জাদুঘরটি পরিদর্শনকালে জানান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই স্মৃতি সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় এটিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা (হেরিটেজ সাইট) হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে শতবর্ষী এই ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি শুধু একটি ভবন নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও জনগণের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।’

এর আগে গত ২৪ মার্চ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন এবং এর বর্তমান অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ২ ডিসেম্বর ভূমিকম্পের প্রভাবে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি সংলগ্ন দেয়ালের একটি অংশ ধসে পড়লে নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের প্রশাসক অর্পিতা দাস গুপ্ত জানান, বিশেষ বরাদ্দের আওতায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজ গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে, যা আগামী জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভবনের দেয়াল স্ক্র্যাপিং, রঙ করা, সীমানা প্রাচীর ও মূল কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, বাগানের আলোকসজ্জা এবং বিশ্রামাগার সংস্কারের কাজ চলছে।

শতবর্ষী এই স্থাপনাকে ‘ইতিহাসের স্মারক প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব বাসস’কে জানান, জাদুঘরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এর মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে তিন ধাপের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে এটিকে হেরিটেজ সাইট ঘোষণা, দ্বিতীয় ধাপে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং তৃতীয় ধাপে আংশিকভাবে দর্শনার্থীদের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম এবং জনগণের আবেগের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। 

তাই একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ সংরক্ষণের স্বার্থে উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন, যাতে শতবর্ষী এই স্থাপনা এবং এর ভেতরে সংরক্ষিত অমূল্য নিদর্শনসমূহ যথাযথভাবে আগের অবস্থায় সংরক্ষিত রাখা যায়। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কোনো নিদর্শন মুছে ফেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরও জানান, চলমান সংস্কার ও মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও কৌতূহল বিবেচনায় বর্তমানে বন্ধ থাকা জাদুঘরের একটি অংশ আবারও খুলে দেওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে। 

আরটিভি/ এসকেডি

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission