নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে নির্মাণশ্রমিকদের প্রাণহানি, উদাসীন কর্তৃপক্ষ

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ , ০৫:২৯ পিএম


নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে নির্মাণশ্রমিকদের প্রাণহানি, উদাসীন কর্তৃপক্ষ
নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে নির্মাণশ্রমিকদের প্রাণহানি। ছবি: আরটিভি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে কাজ করতে গিয়ে কয়েক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিন নির্মাণশ্রমিক। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্তের ফলাফল কিংবা সুপারিশ বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪ এ কাজ করার সময় নিচে পড়ে মারা যান চাঁদপুরের বাসিন্দা রাসেল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এর আগে গত বছরের ২২ মার্চ নির্মাণাধীন আরেকটি ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে প্রাণ হারান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম। সহকর্মীদের অভিযোগ ছিল, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল।

আরও পড়ুন

এছাড়াও ২০১৯ সালের ১৫ মে বিদ্রোহী হলের নির্মাণকাজ চলাকালে অষ্টম তলা থেকে পড়ে মারা যান ২০ বছর বয়সী শ্রমিক হাসান। ওই ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি হয়েছিল, কিন্তু তার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই নির্মাণাধীন একটি ছাত্র হলের বারান্দার ছাদ ধসে অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্বল সাপোর্ট ব্যবহারের কারণেই ছাদ ধসে পড়ে। সেই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও আর প্রকাশ্যে আসেনি।

সম্প্রতি নির্মাণাধীন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক শ্রমিককে কয়েকশ ফুট উঁচুতে সেফটি বেল্ট ছাড়াই কাজ করতে হচ্ছে। কারও মাথায় হেলমেট নেই, অনেকের পায়ে নেই সেফটি বুট। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান তদারকিও দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও শ্রম আইন অনুযায়ী, নির্মাণশ্রমিকদের হেলমেট, সেফটি বুট, গ্লাভস, গগলস ও সেফটি বেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে দুই মিটারের বেশি উচ্চতায় কাজের সময় নিরাপত্তা বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ মাচা, সুরক্ষা জাল ও নিরাপত্তা রেলিং রাখারও বিধান আছে।

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি ভিন্ন। এনএস এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার ওয়াশিম বলেন, শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। ভবনের ভেতরের শেষ পর্যায়ের কাজে অনেকে নিজেরাই সেফটি বেল্ট ব্যবহার করেন না।

ইউটিলিটি ভবন-৪–এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খান অ্যান্ড সন্স বিডি লিমিটেডের প্রকৌশলী জসিম বলেন, নিহত শ্রমিককে সেফটি বেল্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটি ব্যবহার করেননি। এ তথ্য তারা তার সহকারী শ্রমিকের কাছ থেকে জেনেছেন। তবে সেই সহকারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলাম বলেন, প্রকৌশলীরা নিয়মিত কাজ তদারকি করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা বিধি মানতে বলা হয়েছে। তার দাবি, অনেক সময় শ্রমিকরাই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।

পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তদন্তে অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয়। নিহত শ্রমিকের পরিবারের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।

একের পর এক দুর্ঘটনা, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃশ্যমান ঘাটতি—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission