সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার ১০ অমুসলিম দেশ

আরটিভি নিউজ 

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫ , ০৭:৩৭ পিএম


সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার ১০ অমুসলিম দেশ
সংগৃহীত ছবি

বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের মানচিত্রে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয়েও মুসলমানরা গড়ে তুলেছেন নিজেদের স্বকীয় এক জগৎ। কোথাও তারা শত শত বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক, আবার কোথাও তারা আধুনিক সমাজের নতুন প্রজন্মের প্রাণশক্তি। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ভিড়ে এই দেশগুলো আজ মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম—অথচ সেই রাষ্ট্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। কেমন তাদের জীবন কিংবা তাদের সংস্কৃতি? চলুন তবে পরিচিত হই সেইসব অমুসলিম দেশের সঙ্গে, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমানের বসতি।

১. ভারত

দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল দেশ ভারতে প্রায় ২০ কোটির বেশি মুসলমান বাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। ভারত মুঘল সাম্রাজ্যের মতো সমৃদ্ধ ইসলামিক সভ্যতার কেন্দ্র ছিল, যার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অবদান আজও দৃশ্যমান। স্থাপত্যে (তাজমহল, লালকেল্লা), শিল্পকলায় (উর্দু কবিতা), সংস্কৃতিতে (কওয়ালি সংগীত) এবং খাদ্য সংস্কৃতিতে (বিরিয়ানি, কাবাব) ইসলামের ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট। কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে দিল্লি, লখনউ এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে এই সম্প্রদায়ের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেশের সাংস্কৃতিক কাঠামোকে সমৃদ্ধ করেছে।

আরও পড়ুন

২. ইথিওপিয়া

আফ্রিকার শিং নামে পরিচিত ইথিওপিয়ায় প্রায় সাড়ে তিন কোটির মতো মুসলমান বাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম পাতা থেকেই এই দেশটি মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ মর্যাদা বহন করে। ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে যখন মক্কার মুসলমানরা চরম নির্যাতনের শিকার, তখন তৎকালীন খ্রিষ্টান রাজা নাজ্জাশী তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই প্রথম হিজরতের কারণে ইথিওপিয়ার মুসলমানরা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য উপভোগ করে আসছেন। এখানকার মুসলমানরা মূলত দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে ঘনবসতিপূর্ণ এবং তাদের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ইথিওপিয়াকে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করেছে। টিগ্রে অঞ্চলের নাজাশী মসজিদটি এই প্রাচীন ইসলামি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আজও বিদ্যমান।

৩. চীন

পূর্ব এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মের বিকাশ হাজার বছরের পুরোনো, যা মূলত প্রাচীন সিল্ক রুট ধরে বণিকদের মাধ্যমে চীনে প্রবেশ করেছিল। এই দেশে মুসলমানদের জনসংখ্যা দেড় থেকে চার কোটি বলে ধারণা করা হয়, যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১ থেকে ৩ শতাংশ। চীনের মুসলমানরা হুই, উইঘুর, সালার, কাজাখসহ নানা জাতিসত্তায় বিভক্ত। এদের মধ্যে হুই মুসলমানরা তুলনামূলকভাবে চীনের অন্যান্য প্রদেশে বেশি ছড়িয়ে আছেন এবং চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছেন। 

অন্যদিকে, উইঘুররা মূলত পশ্চিম চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাস করেন, যেখানে তাদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনধারা মধ্য এশীয় ধাঁচের। ইসলামের বিস্তার এখানে তাং রাজবংশের সময় থেকে শুরু হয়েছিল এবং আজও চীনের বিভিন্ন প্রান্তে বহু প্রাচীন মসজিদ ও ইসলামিক স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট।

৪. রাশিয়া

ইউরোপ এবং এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত বিশাল ভূখণ্ড রাশিয়াতে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মুসলমানের বসবাস, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। রাশিয়ার অন্যতম বড় এই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শেকড় অত্যন্ত প্রাচীন এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। ককেশাস পাহাড় এবং ভোলগা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে তাতারস্তান ও বাশকোর্তোস্তান প্রজাতন্ত্রে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম বসতি বিদ্যমান। রাশিয়ায় ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত চারটি ধর্মের (খ্রিষ্টান ধর্ম, ইসলাম, ইহুদি ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম) মধ্যে অন্যতম হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। এই বিশাল দেশে, বিভিন্ন জাতীয়তায় ও ভূগোলে মিলেমিশে রাশিয়ার মুসলমানরা গড়ে তুলেছেন এক বহু-সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যময় পরিচয়, যা দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

৫. তাঞ্জানিয়া

আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় দেশ তাঞ্জানিয়াতে প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি মুসলমানের বসতি রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ। ভারত মহাসাগরের ঢেউয়ের মতোই এখানকার সংস্কৃতি বহু শতাব্দী ধরে ইসলামি প্রভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে জানজিবার দ্বীপটি ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাচীন ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য পথে আরব ও পারস্য থেকে আসা বণিকদের হাত ধরে এখানে ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল। এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীর প্রভাব এখানকার সুয়াহিলি ভাষা, স্থাপত্য এবং দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট; যা তাঞ্জানিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

৬. আইভরি কোস্ট

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্ট হলো এমন এক স্থান, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ বা প্রায় এক কোটি ২০ লাখের মতো, যা দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। এখানে ইসলামি সম্প্রদায়ের প্রভাব কেবল সংখ্যায় নয়, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। মুসলমানরা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্যবসা, কারুশিল্প, কৃষি ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই সমাজে সুফি তরিকার প্রভাব অত্যন্ত গভীর; সুফি সাধনা এখানকার সামাজিক উৎসব, সংগীত, শিল্পকলা এবং দৈনন্দিন ঐতিহ্যে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এই গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ আইভরি কোস্টের মুসলমানদের একটি সুসংহত এবং প্রাণবন্ত সম্প্রদায় হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

৭. ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো

মধ্য আফ্রিকার বিস্তৃত সবুজের দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে প্রায় এক কোটি মুসলমানের বসবাস (যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ)। সংখ্যায় কম হলেও তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থিতিশীল এবং প্রাচীন এক সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এখানকার মুসলমানদের আগমন মূলত পূর্ব আফ্রিকা ও সুদান থেকে বাণিজ্য পথের সূত্র ধরে। নানা সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়ভাবে ধরে রেখে টিকে আছেন। ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিক থেকে এই অঞ্চলের মুসলমানরা মূলত সুন্নী শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী, যা তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে আসছে। এই শক্তিশালী ধর্মীয় বন্ধনই তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঐকবদ্ধ থাকতে সহায়তা করেছে।

৮. জার্মানি

জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মুসলমান বাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ ভাগ। ইউরোপের এই অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে ইসলামের প্রসার ও উপস্থিতি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হওয়া গেস্ট ওয়ার্কার কর্মসূচির ফল। এই কর্মসূচির অধীনে ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে তুরস্ক থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে জার্মানিতে আনা হয়েছিল শ্রমবাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য। পরবর্তীকালে, সিরিয়া, আলবেনিয়া, আফগানিস্তান, এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীরা এই মুসলিম জনসংখ্যাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। এই মুসলমান সম্প্রদায় জার্মান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং শ্রমবাজারে সক্রিয়ভাবে অবদান রেখে চলেছেন। তবে তাদের বহুজাতিক পরিচিতি এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি কখনও কখনও জার্মানির মূলধারার সমাজে একীকরণ এবং পরিচয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

৯. ফ্রান্স

ইউরোপের সংস্কৃতি, শিল্প ও রাজনীতির কেন্দ্র ফ্রান্সে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মুসলমানের (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ ভাগ) বসতি রয়েছে, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই মূলত উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য (যেমন আলজেরিয়া, মরক্কো) থেকে আসা অভিবাসীদের পরবর্তী প্রজন্ম। এই সম্প্রদায় ফরাসি সমাজে শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এখানকার কট্টর সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির কারণে মাঝে মাঝেই ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গভীর সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শই ধর্মীয় প্রতীক বা পোশাক (যেমন বোরকা বা হিজাব) জনসমক্ষে প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যা এক দিকে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে অসন্তোষ ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

১০. যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩০ লাখের বেশি মুসলমানের বসবাস, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই মুসলিম জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই মূলত দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত—বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত থেকে আগত অভিবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত। তারা ব্রিটেনের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চিত্র তৈরি করেছেন। লন্ডনের ইস্ট এন্ড, বার্মিংহাম এবং ম্যানচেস্টারের মতো শহরগুলোতে এদের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষণীয়। এই কমিউনিটিগুলো কেবল মসজিদ, মাদ্রাসা বা হালাল খাবারের মতো ধর্মীয় ও দৈনন্দিন জীবনেই প্রভাব ফেলেনি, বরং মূলধারার রাজনীতি, সাহিত্য, খেলাধুলা এবং শিল্পকলাতেও সক্রিয়ভাবে অবদান রাখছে। তাদের নিজস্ব খাবার, পোশাক এবং উৎসব ব্রিটিশ সমাজের বহুজাতিক ফ্যাব্রিকের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

এই দশটি অমুসলিম দেশের তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট প্রমাণ করে, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের উপস্থিতি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে। জাতিগত বৈচিত্র্য, ভাষাগত পার্থক্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব কিছু মিলিয়েই তারা বিশ্ব মুসলিম চিত্রকে করেছে আরও বিস্তৃত, আরও রঙিন।

আরটিভি/এআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission