মানবসভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির পেছনে রয়েছে শ্রমিকের ঘাম ও কঠোর পরিশ্রম। উঁচু ভবন থেকে আধুনিক প্রযুক্তি। সবকিছুর ভিত গড়ে দিয়েছে তাদের নিরলস শ্রম। তবুও বাস্তবে অনেক শ্রমিক আজও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় ইসলাম শ্রম ও শ্রমিককে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
ইসলাম শ্রমকে শুধু জীবিকা নয়, বরং ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, “অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা জুমা, আয়াত : ১০)। এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, ইবাদতের পাশাপাশি পরিশ্রম ও জীবিকার সন্ধানও মুমিন জীবনের অপরিহার্য অংশ।
আরও বলা হয়েছে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরিশ্রমনির্ভর করে। অর্থাৎ শ্রম ছাড়া মানবজীবন কল্পনাও করা যায় না। ইসলামে একজন আদর্শ শ্রমিকের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দক্ষতা ও বিশ্বস্ততাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নবী-রাসূলদের জীবনেও শ্রমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। কেউ ছিলেন কৃষক, কেউ কাঠমিস্ত্রি, কেউ রাখাল, আবার কেউ লৌহশ্রমিক। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ও শৈশবে ছাগল চরিয়েছেন এবং পরবর্তীতে সৎ ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তিনি নিজ হাতে কাজ করতেন এবং শ্রমকে কখনো ছোট করে দেখেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, “শ্রমিক আল্লাহর বন্ধু।” তিনি আরও নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে। এটি ইসলামের শ্রমনীতির একটি মৌলিক ও মানবিক শিক্ষা।
ইসলাম শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে রূপ দিয়েছে। শ্রমিককে অবহেলা নয়, বরং ভাইয়ের মতো আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালিক যা খায়, শ্রমিককেও তা খাওয়ানোর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে না দেওয়ার কঠোর নির্দেশ রয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, কেউ শ্রমিককে নিয়োগ করে তার কাজ সম্পূর্ণ করিয়ে নিলেও যদি তার প্রাপ্য মজুরি না দেয়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। (বুখারি)
সব মিলিয়ে ইসলাম শ্রমিকের অধিকারকে শুধু সামাজিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে ন্যায়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ থাকলেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
তাই শ্রমিক দিবস শুধু একটি দিন নয়, বরং প্রতিদিনের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দেওয়া এবং তাকে মানবিক মর্যাদা দেওয়া—এটাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।
আরটিভি/জেএমএ



