জুমার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার খুতবা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু খুতবা দিতেন না, বরং খুতবার মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান, আমল, নৈতিকতা ও সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) যখন জুমার খুতবা দিতেন, তখন তাঁর চোখ লাল হয়ে যেত, কণ্ঠস্বর উঁচু হতো এবং চেহারায় দৃঢ়তা ও গুরুত্বের ছাপ ফুটে উঠত। মনে হতো তিনি যেন মুসলমানদের সামনে বড় কোনো বিপদের সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। এতে বোঝা যায়, খুতবা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ও উপদেশের মাধ্যম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৭)
খুতবায় তিনি ইসলামের মৌলিক আকিদা, শরিয়তের বিধান, হালাল-হারাম, নেক আমলের গুরুত্ব এবং মানুষের প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়ে আলোচনা করতেন। সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী মুসলমানদের আদেশ-নিষেধ দিতেন। ভুল কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিতেন। যেমন, এক ব্যক্তি খুতবার সময় মসজিদে প্রবেশ করলে তাকে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭৫)
সমাজে অভাব-অনটন দেখা দিলে তিনি খুতবায় সে বিষয় তুলে ধরতেন এবং মুসলমানদের দান-সদকা করতে উৎসাহিত করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৭)।
হাদিসে আরও এসেছে, খুতবার সময় দোয়া বা আল্লাহর জিকির করার সময় রাসুল (সা.) শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭৪) অনাবৃষ্টি দেখা দিলে তিনি জুমার খুতবার মধ্যেই আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করতেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং বৃষ্টি বর্ষণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে মুসল্লিদের সালাম দিতেন। এরপর মিম্বারে উঠে আবার সালাম জানিয়ে বসতেন। এ সময় হযরত বিলাল (রা.) আজান দিতেন। আজান শেষ হলে তিনি দাঁড়িয়ে প্রথম খুতবা দিতেন। এরপর অল্প সময় বসে আবার দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। খুতবা শেষ হলে ইকামত দেওয়া হতো এবং এরপর জুমার নামাজ আদায় করা হতো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৯২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬২)
খুতবা দেওয়ার সময় তিনি লাঠি বা ধনুকের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৯৮) তাঁর মিম্বারে ছিল তিনটি ধাপ। মিম্বার তৈরির আগে তিনি খেজুর গাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) খুতবার সময় তাঁর দিকে মুখ করে মনোযোগ দিয়ে বসতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫০৯)
খুতবার সময় মুসল্লিদের নীরব থাকার ব্যাপারে রাসুল (সা.) কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি খুতবার সময় পাশের লোককে "চুপ থাকো" বলবে, সেও অনর্থক কাজ করবে। তাই খুতবার সময় কথা বলা, অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকা বা মনোযোগ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫১)
জুমার নামাজ শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে গিয়ে দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮২) আবার হাদিসে জুমার পর চার রাকাত সুন্নাত নামাজ আদায়ের কথাও এসেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮১) এ বিষয়ে ইসলামি স্কলার ইবনে তাইমিয়্যা বলেছেন, কেউ যদি মসজিদে সুন্নাত আদায় করেন, তাহলে চার রাকাত পড়বেন। আর ঘরে আদায় করলে দুই রাকাত পড়াই উত্তম। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৪)
ইসলামি শিক্ষায় জুমার খুতবা শুধু একটি বক্তব্য নয়; এটি মুসলমানদের জন্য শিক্ষা, উপদেশ, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর পথে চলার আহ্বান। তাই খুতবার সময় মনোযোগ দিয়ে শোনা, নীরব থাকা এবং খুতবার শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
আরটিভি/জেএমএ




