সপ্তাহের সেরা দিন জুমা। ইসলামে এই দিনকে মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে জুমার দিনের মর্যাদা, ফজিলত এবং এ দিনে করণীয় নানা আমলের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও জুমার দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং উম্মতকে এ দিনের আমলগুলো পালনের তাগিদ দিয়েছেন। তাই জুমার দিনটি শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইবাদত, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণে কাটানোর একটি বিশেষ সুযোগ।
১. ফজরের নামাজে বিশেষ দুটি সূরা তিলাওয়াত
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের ফজরের নামাজে সূরা আস-সাজদাহ ও সূরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করতেন। কারণ এই দুই সূরায় মানবজাতির সৃষ্টি, পরকাল ও গুরুত্বপূর্ণ নানা ঘটনার আলোচনা রয়েছে।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮০।)
২. বেশি বেশি দরুদ পাঠ
জুমার দিন ও রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ... فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ
উচ্চারণ: ইন্না মিন আফদালি আইয়ামিকুম ইয়াওমুল জুমু'আহ... ফা আকসিরু আলাইয়্যা মিনাস সালাহ ফীহি।
অর্থ: "তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭; সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ১৩৭৪।)
৩. গোসল করে পবিত্র হওয়া
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলো গোসল করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ
উচ্চারণ: গুসলু ইয়াওমিল জুমু'আতি ওয়াজিবুন আলা কুল্লি মুহতালিম।
অর্থ: "প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য জুমার দিনের গোসল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪৬।)
৪. সুগন্ধি ব্যবহার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
জুমার দিনে মিসওয়াক করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।
হজরত সালমান আল-ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গোসল করে, যথাসম্ভব পবিত্রতা অর্জন করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে, মসজিদে গিয়ে অন্যকে কষ্ট না দিয়ে বসে এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, আল্লাহ তার দুই জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩।)
৫. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
খুতবার সময় কথা বলা বা অন্যকে চুপ করতে বলাও নিষেধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ أَنْصِتْ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ
উচ্চারণ: ইযা কুলতা লিসাহিবিকা আনসিত ওয়াল ইমামু ইয়াখতুবু ফাকাদ লাগাওতা।
অর্থ: "ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি পাশের ব্যক্তিকে 'চুপ থাকো' বলো, তবে তুমিও অনর্থক কাজ করলে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫১।)
৬. সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা
জুমার দিনে পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা সুন্নত। এটি ইসলামের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষার অংশ।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৭৮।)
৭. হেঁটে মসজিদে যাওয়া
হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গোসল করে হেঁটে মসজিদে যায়, ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল নামাজের সওয়াব লেখা হয়।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫; জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪৯৬।)
৮. গুনাহ মাফের সুসংবাদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ... مُكَفِّرَاتٌ مَا لَمْ تُغْشَ الْكَبَائِرُ
উচ্চারণ: আস-সালাওয়াতুল খামসু ওয়াল জুমু'আতু ইলাল জুমু'আহ...
অর্থ: "পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত সময়ের ছোট গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩।)
৯. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন আল্লাহ বান্দার দোয়া ফিরিয়ে দেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
فِيهَا سَاعَةٌ لَا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ... إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ
উচ্চারণ: ফীহা সা'আতুন লা ইউওয়াফিকুহা আবদুন মুসলিম...
অর্থ: "জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা তাকে দান করেন।"
অন্য এক হাদিসে এসেছে, এই সময়টি আছরের পরের শেষ ভাগে অনুসন্ধান করতে।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮।)
সুরা কাহাফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ
উচ্চারণ: মান কারা সূরাতাল কাহফি ইয়াওমাল জুমু'আতি আদা'আ লাহু মিনান নূরি মা বাইনাল জুমু'আতাইন।
অর্থ: "যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর জ্বলতে থাকবে।"
(আল-মুস্তাদরাক লিল হাকিম, হাদিস: ৩৩৯২; সহিহুত তারগিব, হাদিস: ৭৩৬।)
জুমার দিনকে ইবাদতে ভরিয়ে তুলুন
আলেমদের মতে, জুমার দিন আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকতের দিন। তাই এ দিন গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার, আগে আগে মসজিদে যাওয়া, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত এবং আন্তরিকভাবে দোয়া করার মাধ্যমে একজন মুসলিম মহান সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারেন।
আরটিভি/জেএমএ



