বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের উত্তেজনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কঠোর শৃঙ্খলা ও নানা বিধিনিষেধও। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে খেলোয়াড়দের মাঠের ভেতর ও বাইরের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে ফিফা, আইএফএবি এবং বিশ্ব ডোপবিরোধী সংস্থা (ওয়াদা)।
গোল করার পর আবেগে জার্সি খুলে উদ্যাপন করা ফুটবলে পরিচিত দৃশ্য হলেও এবার এমনটা করলে খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখতে হবে। একইভাবে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দর্শকদের উসকানি দেওয়া কিংবা মাত্রাতিরিক্ত উদ্যাপনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মাঠে আংটি, চেইন, ব্রেসলেটসহ যেকোনো ধরনের গয়না পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে চিকিৎসক ও রেফারির অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যান্ডেজ, ফেস মাস্ক বা অন্যান্য সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া জার্সির ভেতরের পোশাক বা গেঞ্জিতে রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বার্তা প্রদর্শনেরও অনুমতি নেই।
ম্যাচ চলাকালে রেফারির সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথন করা গেলেও আক্রমণাত্মক আচরণ, গালিগালাজ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে হলুদ কিংবা লাল কার্ডের মুখোমুখি হতে হবে। ফাউলের ভান করা বা ডাইভ দিয়ে রেফারিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও শাস্তি এড়ানোর সুযোগ নেই।
টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, দুটি পৃথক ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হবে। অন্যদিকে লাল কার্ড দেখলে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছাড়তে হবে। রেফারির নির্দেশ মানতে দেরি করলে বা গড়িমসি করলে শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে কোনো খেলোয়াড় অচেতন হলে চিকিৎসক ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। ঝুঁকি থাকলে তাকে আর মাঠে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে না।
মাঠের বাইরেও সবচেয়ে কঠোর নজরদারি থাকছে ডোপ টেস্ট নিয়ে। বিশ্বকাপ চলাকালে ম্যাচ শেষে, অনুশীলনের সময় কিংবা টিম হোটেলেও যেকোনো মুহূর্তে খেলোয়াড়দের ডোপ পরীক্ষার জন্য ডাকা হতে পারে। পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানো বা নমুনা নিয়ে কারচুপির চেষ্টা করলে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকলেও সেখানে বর্ণবাদী, আপত্তিকর বা রাজনৈতিক উসকানিমূলক কোনো পোস্ট করা যাবে না। একই সঙ্গে ফিফার নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন ও মিডিয়া কার্যক্রমে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের জন্য বাধ্যতামূলক। অনুমতি ছাড়া এসব কার্যক্রম এড়িয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে জরিমানা গুনতে হতে পারে।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও রয়েছে কড়া বিধিনিষেধ। কোনো খেলোয়াড় অফিশিয়াল অনুষ্ঠান বা সাক্ষাৎকারে অননুমোদিত স্পনসর কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডের প্রচারণা চালাতে পারবেন না। এছাড়া দলীয় ক্যাম্প বা হোটেলের বাইরে যেতে হলে কোচিং স্টাফ ও টিম ম্যানেজমেন্টের অনুমতি প্রয়োজন হবে। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ফিফা নির্ধারিত অফিশিয়াল যানবাহন ব্যবহার করতে হবে।
তবে সব নিয়মের মধ্যেও ফুটবলের কিছু ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য অটুট রাখা হয়েছে। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের সঙ্গে জার্সি বিনিময়ের প্রচলিত রীতিতে কোনো বাধা নেই। পাশাপাশি বর্ণবাদবিরোধী সচেতনতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফিফার পূর্বানুমোদিত বার্তা বা প্রতীকী কর্মসূচি যেমন: ম্যাচ শুরুর আগে হাঁটু গেড়ে সংহতি প্রকাশ করার সুযোগও থাকছে দলগুলোর জন্য।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফুটবলারদের শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, আচরণ, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বও থাকবে কঠোর নজরদারির আওতায়।
আরটিভি/এমএইচজে




