ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ শুরুর আগে এক পরিচিত ও হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য প্রায় সব দর্শকের চোখে পড়ে খেলোয়াড়দের হাত ধরে ছোট ছোট শিশুরা মাঠে প্রবেশ করছে। বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা বিভিন্ন ঘরোয়া লিগ সব জায়গাতেই এই দৃশ্য এখন নিয়মিত। কিন্তু এই শিশু কারা, আর কেনই বা তারা খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামে?
এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের একটি ইতিহাস, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং শিশুদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার এক মানবিক উদ্যোগ।
যেভাবে শুরু
এই প্রথার সঠিক সূচনা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুল ও এভারটন এর একটি ম্যাচে খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে নামতে দেখা যায়, যা তখন আলোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে ২০০০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশ এই প্রথাকে আরও পরিচিত করে তোলে।
তবে বিশ্বব্যাপী এই ধারণা জনপ্রিয়তা পায় ২০০২ সালের বিশ্বকাপে, যখন ফিফা এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে ‘শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন’ প্রচারণা চালায়। সেই সময় প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে শিশু মাঠে প্রবেশ করত, যা শিশু অধিকার ও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করে।

কেন মাঠে শিশুদের আনা হয়
বর্তমানে বিভিন্ন ক্লাব ও টুর্নামেন্টে এই প্রথার উদ্দেশ্য একাধিক। প্রধান লক্ষ্য হলো ফুটবলকে পরিবারবান্ধব পরিবেশে উপস্থাপন করা এবং শিশুদের খেলাধুলার সঙ্গে আগ্রহী করে তোলা।
অনেক সময় বড় স্পন্সরদের উদ্যোগেও শিশুদের সুযোগ দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বকাপের দীর্ঘদিনের স্পন্সর ম্যাকডোনাল্ডস বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিজয়ী শিশুদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামার সুযোগ দেয়।
এছাড়া দাতব্য উদ্যোগের অংশ হিসেবেও এই প্রথা ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্লাব শিশুদের অভিজ্ঞতা আরও বিশেষ করে তুলতে কঠিন রোগে আক্রান্ত বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আমন্ত্রণ জানায়, যাতে তারা তাদের প্রিয় তারকাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারে।

শিশু নির্বাচন কীভাবে হয়
সাধারণত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের এই সুযোগ দেওয়া হয়। খুব ছোট শিশুরা দর্শকভিড় ও চাপ সামলাতে পারে না, আর ১৭ বছরের বেশি বয়সীদের আর শিশু হিসেবে ধরা হয় না এই কারণেই এই বয়সসীমা।
নির্বাচনের পদ্ধতিও বিভিন্ন রকম। অনেক ক্লাব তাদের দীর্ঘদিনের সমর্থকদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দেয়। আবার কোথাও লটারি বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সুযোগ দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে স্পন্সর বা একাডেমির মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে ইংল্যান্ডের চেলসি ক্লাব প্রতি বছর শত শত আবেদন থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিশুকে সুযোগ দেয়, যদিও জনপ্রিয়তার কারণে সেখানে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা থাকে।
ম্যাসকট নাকি প্লেয়ার এসকর্ট
ফুটবল জগতে এই শিশুদের সাধারণত দুইভাবে পরিচয় দেওয়া হয়“ম্যাসকট” এবং “প্লেয়ার এসকর্ট”। যদি একজন শিশু পুরো দলের সঙ্গে থাকে, তাকে ম্যাসকট বলা হয়। আর যদি নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে মাঠে নামে, তবে তাকে প্লেয়ার এসকর্ট বলা হয়।
মানবিক ও অনুপ্রেরণার দিক
এই প্রথা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি শিশুদের জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণার মুহূর্ত। হাজারো দর্শকের সামনে প্রিয় তারকার হাত ধরে মাঠে নামা অনেক শিশুর জীবনে স্বপ্নের বীজ বপন করে।
এমনকি ফুটবল ইতিহাসে এমন উদাহরণও আছে যেখানে সাবেক ম্যাসকট পরবর্তীতে বড় ফুটবলার হয়েছেন। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ওয়েন রুনিও ছোটবেলায় এভাবেই মাঠে প্রবেশ করেছিলেন।
খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশের এই ঐতিহ্য এখন বিশ্ব ফুটবলের একটি সুন্দর মানবিক প্রতীক। এটি শুধু খেলার অংশ নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর একটি মাধ্যম যেখানে একটি ছোট মুহূর্তই ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নের জন্ম দিতে পারে।
আরটিভি/এসকে



