শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন তিনি। কিছুক্ষণ পর দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। চারপাশ থেকে ছুটে এলেন সতীর্থরা। কেউ তাকে জড়িয়ে ধরলেন, কেউ কাঁধে হাত রাখলেন। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার চোখের পানি তখন শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের মুহূর্তের প্রতীক।
বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার স্পেন জাতীয় ফুটবল দলকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। আর এই অবিশ্বাস্য ফলের নেপথ্যের সবচেয়ে বড় নায়ক ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা।

বিশ্বকাপের মঞ্চে বড় অঘটনের পেছনে প্রায়ই থাকেন কোনো না কোনো অপ্রত্যাশিত নায়ক। এবার সেই ভূমিকায় ভোজিনহা। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দলের রক্ষাকবচ। ফেরান তোরেস, পেদ্রি ও আইমেরিক লাপোর্তের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে ম্যাচসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন এই অভিজ্ঞ গোলকিপার।
ভোজিনহার প্রকৃত নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। তবে ফুটবল বিশ্বে তিনি পরিচিত ‘ভোজিনহা’ নামেই। পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ ‘ছোট দাদি’।
শৈশবে তার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং মা কাজের ব্যস্ততায় থাকতেন। ফলে জীবনের বড় একটি সময় তিনি দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছেন। সেখান থেকেই তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘ভোজিনহা’।

কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে শহর থেকে শুরু হয় তার ফুটবলযাত্রা। পরবর্তীতে আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেললেও নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে ‘ভোজিনহা’ নামটিই ধরে রেখেছেন।
চলতি বছরের শুরুতে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি যখন অ্যাঙ্গোলায় খেলতে যাই, সেখানে জোসিমার নামের আরেকজন গোলরক্ষক ছিল। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই জার্সিতে ‘জোসিমার-২’ লিখব না। কেপ ভার্দেতে সবাই আমাকে ভোজিনহা নামেই চিনত, তাই সেই নামটাই রেখে দিয়েছি।
বর্তমানে তিনি পর্তুগালের ক্লাব ক্লাব শ্যাভেসের হয়ে খেলেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কেপ ভার্দে, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন এই গোলরক্ষক।

বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই আলো ছড়িয়ে ভোজিনহা বলেন, নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। আমি কেঁদেছি কারণ আমার দাদা-দাদি আজ বেঁচে নেই। তারা আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন।
মায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ভিসা জটিলতার কারণে তার মা গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
আমার মা এখানে থাকতে পারেননি। ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সময়মতো সবকিছু করা সম্ভব হয়নি, বলেন তিনি।
স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর রাতারাতি জনপ্রিয়তা বেড়েছে ভোজিনহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা কয়েক লাখ থেকে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েছেন ফুটবল অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ। পল পগবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক সত্যিই অবিশ্বাস্য, ওয়াও!
অন্যদিকে সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সন বলেন, আমি সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এই একটি পয়েন্ট কেপ ভার্দের প্রাপ্য ছিল। আজকের রাতটা শুধু তাদের। ভোজিনহাকে কাঁদতে দেখে আমার নিজেরই প্রায় কান্না চলে আসছিল।
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র শুধু একটি ম্যাচের ফল নয় এটি কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এক নাম ভোজিনহা।
আরটিভি/এসকে



