‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে। আর এই মহাযজ্ঞের ম্যাচ দেখতে মুখিয়ে থাকে সারাবিশ্বের ফুটবল ভক্তরা। তবে মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ পেয়ে থাকে, খুবই কম সংখ্যক দর্শক। যার অন্যতম কারণ হলো ভিসা জটিলতা ও অর্থের অভাব।
বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে দর্শকদের মতো পাড়ি জমাতে হয় এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে। আর এই ভিসা, বিমানের টিকিট, আবাসন ও ম্যাচের টিকিট মিলিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয় দর্শকদের।
ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের উচ্চ অর্থনীতির দেশগুলো থেকে দর্শকরা নিয়মিত বিশ্বকাপ দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। তবে এশিয়ার মধ্য ও নিম্ন মধ্য আয়ের দেশগুলো থেকে বিশ্বকাপ খেলা মাঠে বসে দেখতে চাওয়া অনেকটা বিলাসিতার মতো।
কিছু মানুষের কাছে অর্থ থাকলেও পড়তে হয় ভিসা জটিলতায়। যেখান থেকে পার হওয়া খুবই কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। যা সাধারণ দর্শকদের জন্য একটি ভোগান্তি। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যেতে হলে কি কি বাধা অতিক্রম করতে হবে।
এই প্রতিবেদনে সেই সব বিষয়েই আলোচনা করা হলো—
এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এই আসরের ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে হলে কত খরচ হবে তা নির্ভর করবে কোন শহরে যাচ্ছেন, কোন দল খেলছে, টিকিট কোথা থেকে কিনছেন, কত রাত থাকছেন, আগে থেকে ভিসা আছে কি না—এসবের ওপর।
সাধারণ হিসেবে দেখা যায়, ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দেখে তিন রাত থেকে ফিরতে চাইলে একজন বাংলাদেশি দর্শকের খরচ পড়তে পারে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকার মধ্যে। আর ফাইনাল দেখতে চাইলে খরচ ১০ লাখ টাকার অনেক ওপরে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
প্রথমেই ভিসা আবেদন
বিশ্বকাপ যাত্রার প্রথমেই আসবে ভিসা। যুক্তরাষ্ট্রে যেতে বি১/বি২ ভিসা লাগবে বাংলাদেশি দর্শকের। ভিসা আবেদন ফি ১৮৫ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৩ হাজার টাকা। তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা অনুমোদনের পর আবেদনকারীকে ৫ হাজার, ১০ হাজার বা ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য বন্ড দিতে বলা হতে পারে।
এটি সরাসরি খরচ নয়; নিয়ম মেনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু ভ্রমণের আগে এত বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে। ৫ হাজার ডলার মানে প্রায় ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, আর ১৫ হাজার ডলার মানে প্রায় ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
তবে বিশ্বকাপ দর্শকদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা কিছু ফিফা বিশ্বকাপ টিকিটধারীর ক্ষেত্রে ভিসা বন্ড মওকুফ হতে পারে। বিশেষ করে যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিফার টিকিট কিনেছেন এবং ফিফার অগ্রাধিকারভিত্তিক ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য হতে পারে।
বিমান ভাড়া
ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি বা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বড় শহরে যাওয়া-আসার টিকিটের মূল্য সময়ভেদে অনেক ওঠানামা করে। বর্তমান বাজারে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে ইকোনমি ক্লাসে যাওয়া-আসার ভাড়া সাধারণত দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বিশ্বকাপের সময়, ম্যাচের শহর, বুকিংয়ের সময় এবং ট্রানজিটভেদে এই খরচ আরও বাড়তে পারে। নিরাপদ হিসাব করতে গেলে বিমানভাড়ার জন্য অন্তত ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা ধরে রাখা উচিত।
ম্যাচের টিকিট
প্রথম দুই ধাপ পেরেনোর পর গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচের টিকিট। ছোট দল বা কম চাহিদার গ্রুপ ম্যাচ হলে তুলনামূলক কম দামে টিকিট পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব বাজারে অনেক ম্যাচেই ৩০০ ডলারের নিচে টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি টাকায় সেটি প্রায় ৩৭ হাজার টাকা।
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র বা বড় শহরের ম্যাচ হলে টিকিটের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অনেক ম্যাচে ৬০০-৭০০ ডলার, অর্থাৎ ৭৫ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকা ধরে প্রস্তুত থাকাই বাস্তবসম্মত। নিউইয়র্ক, মায়ামি বা বড় ম্যাচ হলে ১ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার টাকাও লাগতে পারে।
আবাসন ব্যয়
বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আয়োজক শহরে হোটেল ভাড়া বেড়েছে। তুলনামূলক কম খরচের শহরে ২৫০-৩০০ ডলার রাতপ্রতি হোটেল ধরলেও তিন রাতের জন্য খরচ হবে প্রায় ১ লাখ টাকা। লস অ্যাঞ্জেলেসে সেই হিসাব ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি যেতে পারে। নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি এলাকায় তিন রাতের হোটেল খরচ ২ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। ফাইনালের সপ্তাহে এই খরচ আরও অনেক বেশি।
খাওয়া ও যানবহন ব্যয়
যুক্তরাষ্ট্রে দিনে তিন বেলা সাধারণ খাবার, পানি, কফি বা হালকা খাবার মিলিয়ে ৫০-৮০ ডলার খরচ খুব স্বাভাবিক। চার দিনের ভ্রমণ ধরলে খাবারে লাগতে পারে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। স্টেডিয়ামের ভেতরে খাবার-পানীয় কিনলে খরচ আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে স্থানীয় যাতায়াতের জন্য আলাদা বাজেট রাখতে হবে।
বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে স্টেডিয়াম, ম্যাচ শেষে ফেরার ভাড়া—সব মিলিয়ে ১৫০-২৫০ ডলার ধরে রাখা ভালো। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। বড় শহরে অ্যাপভিত্তিক গাড়ি বা ম্যাচের দিন বিশেষ যাতায়াত ব্যবহার করলে খরচ আরও বেশি হতে পারে।
এর বাইরে থাকবে ভ্রমণ বিমা, মোবাইল সিম বা রোমিং, ভিসা ফটো, ডকুমেন্ট প্রিন্ট, ছোটখাটো জরুরি খরচ, শহর ঘোরা, হয়তো একটি জার্সি বা স্মারক কেনা। এসব মিলিয়ে আরও ৩০-৫০ হাজার টাকা ধরে রাখা নিরাপদ।
ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি ম্যাচ দেখতে মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ৪ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা।
আরটিভি/এসআর



