ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন ১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই। দিনটিতে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স। ফাইনালে অসামান্য অবদান ও জোড়া গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে ফরাসিদের কিংবদন্তিতে পরিণত হন জিনেদিন জিদান। সেই বছরের ১৩ মে জিদানের ঘরে জন্ম নিয়েছিল তার দ্বিতীয় পুত্র সন্তান লুকা। বুধবার (১৭ জুন) সেই লুকার-ই অভিষেক হতে যাচ্ছে আলজেরিয়ার জার্সিতে। দেশটির পক্ষ থেকে তার গুরুদায়িত্ব থাকবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা থেকে জাল অক্ষত রাখার।
ফ্রান্সের এক্স-অঁ-প্রোভঁস শহরে জন্ম নেওয়া লুকা জিদান ফরাসি যুবদলের হয়ে খেলেছেন এবং ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন। তার বাবা ফরাসি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কিংবদন্তি হওয়া সত্ত্বেও, নিজের শিকড়ের টানকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই গত সেপ্টেম্বর মাসে গ্রানাডার এই গোলরক্ষক আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।
লুকার দাদা-দাদি, ইসমাইল ও মালিকা, ১৯৬২ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। সেই পারিবারিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বন্ধনই লুকার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সেই ১০১ জন খেলোয়াড়ের একজন, যারা ফ্রান্সে জন্ম নিয়েও অন্য দেশের হয়ে খেলছেন।
লুকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি যখন আলজেরিয়ার কথা ভাবি, তখন সবার আগে আমার দাদার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই আমরা আলজেরীয় সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছি, আর এই ভালোবাসা আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন আমার দাদা-দাদি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে জাতীয় সংগীত শুনলে আমি অবিশ্বাস্য আবেগ অনুভব করি।’
নিজের বাবা জিনেদিন জিদানের মতোই, যিনি কখনও নিজের আলজেরীয় শিকড় লুকাননি, লুকাও সবসময় নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত ছিলেন। আর সেটিই শেষ পর্যন্ত তাকে আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।
তবে কেবল আবেগ নয়, বাস্তবতাও ছিল একটি কারণ। উগো লরিসের যুগ শেষ হওয়ার পর মাইক মেনিয়ঁ ফ্রান্সের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে ফরাসি জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা লুকার জন্য অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতেও আলজেরিয়ার ডাক তার জন্য হয়ে ওঠে হৃদয়ের টানে নেওয়া এক স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
ভাই এনজো, থিও এবং এলিয়াজের মতোই লুকা জিদানও ফুটবলের হাতেখড়ি নিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে। ২০১৮ সালের ১৯ মে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র ম্যাচে বাবা জিদানের অধীনে রিয়ালের প্রথম দলে অভিষেকও হয়েছিল লুকার।
তবে রিয়াল মাদ্রিদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা এবং থিবো কোর্তোয়া ও কেইলর নাভাসের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষকদের ছায়ায় পড়ে যাওয়ায় তিনি নতুন পথ খোঁজার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর তিনি রায়ো ভায়োকানো, রেসিং সান্তান্দার এবং এসডি এইবারের হয়ে খেলেন। অবশেষে তিনি নিজের ঠিকানা খুঁজে নেন গ্রানাডায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ৪৫ ম্যাচে মাঠে নেমে ১৫টি ক্লিন শিট রেখেছেন এবং ধারাবাহিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপে তার অংশগ্রহণ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। এপ্রিল মাসে আলমেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফরোয়ার্ড অস্কার নাসেইয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে তার চোয়াল ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত লাগে। সৌভাগ্যক্রমে সুস্থ হয়ে ফিরলেও আক্রান্ত অংশকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষভাবে তৈরি একটি মুখোশ পরে খেলবেন তিনি।
কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা, দক্ষ ও নান্দনিক ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ছেলে হয়ে লুকা কেন গোলরক্ষক হলেন?
এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তার বড় ভাই এনজোর। লুকা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি ভাইয়ের সঙ্গে ফুটবল খেলতাম। আমি আকারে ছোট ছিলাম বলে সে সবসময় আমাকে গোলপোস্টে দাঁড় করিয়ে দিত। সে বলত আমি নাকি বেশ ভালো গোলরক্ষক, যদিও এখনো জানি না সে সত্যি বলেছিল নাকি মজা করেছিল।’
তবে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ার ইচ্ছাও তাকে এই পথে এনেছে। লুকা ব্যাখ্যা করেন, ‘আমি গোলরক্ষক হিসেবেই থেকে গেছি কারণ আমার ব্যক্তিত্ব আলাদা। আমি বাবার সঙ্গে তুলনা পছন্দ করি না, আর গোলরক্ষক হলে তাঁর সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।’
২৮ বছর বয়সী এই ফুটবলার মাঠের বাইরেও নিজের পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা তার বিখ্যাত পদবির ভার থেকে আলাদা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বেশ সক্রিয় এবং নিজের ফ্যাশন-সচেতনতা ও ব্যক্তিগত স্টাইল নিয়মিত তুলে ধরেন।
‘ওল্ড মানি’ ট্রেন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ক্লাসিক, বহুমুখী ও মার্জিত পোশাক তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। লিনেন শার্ট, টেক্সচারযুক্ত পোলো শার্ট, ঢিলেঢালা পোশাক এবং ঘড়ি বা সানগ্লাসের মতো সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ তাঁর স্টাইলের নিয়মিত অংশ।
লুকা বলেন, ‘আমি সবসময় বলেছি, আমি আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করি এবং এই পদবি বহন করতে গর্ববোধ করি। কিন্তু ফুটবলে আমি চাই মানুষ আমাকে লুকা হিসেবে চিনুক, বাবার সঙ্গে তুলনা করে নয়।’
সকালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন লুকা। আর সেখান থেকেই শুরু করতে চাইবেন নিজের স্বতন্ত্র উত্তরাধিকার রচনার গল্প।
আরটিভি/এমএম


