ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সুন্দর সেতু ফুটবল। এই খেলাই দুঃখ-সুখ, জয়-পরাজয়ের সীমা পেরিয়ে মুহূর্তেই ভেঙে দিতে পারে বিভেদের দেয়াল। সেই দর্শনেরই জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল। উদ্বাস্তু অধ্যুষিত একটি কলোনি থেকে উঠে এসে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করে তিনি লিখেছেন অনুপ্রেরণার এক অনন্য গল্প।
ইয়ামালের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তার বাবা মুনির নাসরাউই ও মা শিলা এবানা গিনির। মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির অভিবাসী এই দম্পতি চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। জীবনের অনিশ্চয়তার কাছে হার না মেনে তারা বিশ্বাস করেছিলেন, একদিন তাদের সন্তান বড় কিছু করবে।
ইয়ামালের পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক আবেগঘন ইতিহাস। 'লামিনে' এসেছে আরবি 'আল-আমিন' শব্দ থেকে, যার অর্থ বিশ্বস্ত বা সৎ। আর 'ইয়ামাল' এসেছে 'জামাল' শব্দ থেকে, যার অর্থ সৌন্দর্য। তবে এই নাম শুধু অর্থবহ নয়, এটি কৃতজ্ঞতারও প্রতীক। সন্তানের জন্মের সময় আর্থিক দুরবস্থায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পরিবারের দুই বন্ধু লামিনে ও ইয়ামাল। তাদের সম্মান জানাতেই ছেলের নাম রাখা হয় দুই বন্ধুর নাম মিলিয়ে।

জন্মের মাত্র পাঁচ মাস পর ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির কোলে ওঠার একটি ছবি আজও ভক্তদের কাছে স্মরণীয়। তবে শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মায়ের কাছেই বড় হন ইয়ামাল। কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করেছিলেন তার বাবা।
অভাবের সংসারে ছেলের জন্য একজোড়া ফুটবল বুট কেনার সামর্থ্যও ছিল না মুনির নাসরাউইয়ের। তিনি স্থানীয় এক জুতা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধার করে বুট এনে বলেছিলেন, একদিন আমার ছেলে বড় হয়ে এই ঋণ শোধ করবে। আজ সেই ছেলেই বিশ্বের অন্যতম দামি ফুটবলারদের একজন। তবুও বাবার সেই ত্যাগ কখনও ভোলেননি ইয়ামাল।
১২ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই বিশ্বফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকায় পরিণত হন তিনি। তবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও ভুলে যাননি নিজের শিকড়। তার হাতের আঙুলে লেখা থাকে '৩০৪', যা তার শৈশবের এলাকা রোকাফোন্দার পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। গোল উদযাপনের সময়ও সেটিই দেখান তিনি।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহরের অভিবাসী অধ্যুষিত রোকাফোন্দা এলাকাই আজ ইয়ামালের কারণে নতুন পরিচয় পেয়েছে। সেই এলাকার ছোট্ট মাঠ, সরু গলি আর সাধারণ মানুষের জীবন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। সেখানে ইয়ামালের ছবি শুধু পোস্টারে নয়, হাজারো শিশুর স্বপ্নেও।
বিশ্বকাপ জয়ের মঞ্চেও নিজের পরিচয় ও শিকড়কে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন এই স্প্যানিশ তারকা। তার হেডব্যান্ডে ছিল 'রোকাফোন্দা'র নাম, আর বুটে ছিল বাবা-মায়ের জন্মভূমি মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির পতাকা।
ইয়ামালের জীবনের গল্প যেন জন লেননের বিখ্যাত উক্তিকেই নতুন করে সত্য প্রমাণ করে স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে একদিন সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়। উদ্বাস্তু কলোনির সংকীর্ণ গলি থেকে বিশ্বজয়ের মঞ্চে পৌঁছে তিনি শুধু একটি ট্রফিই জেতেননি জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়।
আরটিভি/এসকে




