আর ৫১ দিন পর রাশিয়ার ১২টি স্টেডিয়ামে বিশ্বের ৩২টি দল এক মাসব্যাপী যুদ্ধে নামবে সোনালী ট্রফির জন্য। যা‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’নামেও পরিচিত।
প্রতি ম্যাচেই মাঠে থাকবে দুই দল, ২২ খেলোয়াড় আর পাঁচ রেফারি। ১২০ মিটারের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা দুই গোলপোস্টের মাঝে টানা ৯০ মিনিটের অবিরাম ‘ছোটাছুটি’। অথচ গ্যালারি-ভর্তি দর্শকের নজর দুলতে থাকবে কেবল একটি বস্তুকে কেন্দ্র করে। আর তা হলো, ফুটবল।
অবশ্য শুরুর দিকে ফুটবল খেলাটা এত উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন ছিল না। দিনে দিনে খেলাটি উঠে এসেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এরই সঙ্গে এসেছে ফুটবলের উন্নত সংস্করণ। উন্নত ফুটবল তৈরির জন্য যুগের পর যুগ গবেষণা হয়েছে। এখনও চলছে।
১৯৭০ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ৯ম আসর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এডিডাসের তৈরী বল দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের যাত্রা শুরু। এর আগে স্বাগতিক দেশের স্থানীয় ও বিশ্বের নামকরা ফুটবল কোম্পানীর তৈরী বল থেকে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বিশ্বকাপের জন্য সেরা বলটি নির্বাচন করত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেরা বল বাছাইয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ সমস্যা দূর করতেই ফিফা এডিডাসের সঙ্গে বিশ্বকাপের বল তৈরির চুক্তি করে। তখন (১৯৭০) থেকেই এডিডাস বিশ্বকাপে সর্বাধুনিক বল যোগান দিয়ে আসছে। তবে তারা স্বাগতিক দেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করেই বলের রঙ ও ডিজাইন করে থাকে।
তাই ১৯৩০ সাল থেকে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের বলগুলোর পরিচিতি নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন।
১৯৩০ উরুগুয়ে(তিয়েন্তো)
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলে যে বল দিয়ে খেলা হয়, তার নাম ছিল তিয়েন্তো। উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে কোন বল দিয়ে খেলা হবে তা নিয়ে এক সমস্যা হয়েছিল। পরে সিদ্ধান্ত হয় প্রথমার্ধ খেলা হবে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে। আর দ্বিতীয়ার্ধ খেলা হবে উরুগুয়ের বল দিয়ে। ফাইনাল খেলায় প্রথম ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার বলে খেলা হয়। আর আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু খেলার দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বলে খেলা হয় এবং শেষ পর্যন্ত উরুগুয়ে ৪-২ গোলে বিশ্বকাপ জয় করে।
১৯৩৪ ইতালি(প্যানেল ১২)
১৯৩৪ সালের ২য় বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল ইতালিতে। ১২ প্যানেলের বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। সে বছর ফাইনালে ইতালি ১-০ গোলে চেকোশ্লাভিয়াকে পরাজিত করেছিল।
১৯৩৮ ফ্রান্স(ব্রাউন)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৮ সালের ৩য় বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল ফ্রান্সে। ফ্রান্স তখন যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। কিন্তু খেলা হয়েছিল। স্থানীয় বল কোম্পানির ১২ প্যানেলের বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। ফাইনালে ইতালি ৪-২ গোলে হাঙ্গেরিকে পরাজিত করেছিল।
১৯৫০ ব্রাজিল(বেলো হরিজন্তে)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালের ৪র্থ বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল ব্রাজিলে। সে বছর স্থানীয় কোম্পানির তৈরি করা বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তের তৈরি করা বল দিয়ে ফাইনাল খেলা হয়। আর বলটি ছিল ১২ প্যানেলের। উরুগুয়ে সেই খেলায় ব্রাজিলকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছিল।
১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড(প্যানেল ১৮)
১৯৫৪ সালের ৫ম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল সুইজারল্যান্ডে। সে বছর তখন পর্যন্ত ইউরোপে তৈরি ১৮ প্যানেলের সবচেয়ে আধুনিক বল দিয়ে খেলা হয়েছিল। ফাইনালে জার্মানি সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হাঙ্গেরিকে পরাজিত করেছিল।
১৯৫৮ সুইডেন(জিগজাগ)
১৯৫৮ সালের ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল সুইডেনে। সে বছর এক খেলায় ফ্রান্স সবচেয়ে বেশি ১৩ গোল করার রেকর্ড করেছিল। বল ছিল অনেকটা জিগজাগ টাইপের। বলের গায়ে খুব পাতলা আবরণ ছিল। আর বলটি ছিল একটু হালকা। ফাইনালে ব্রাজিল ৫-২ গোলে সুইডেনকে পরাজিত করেছিল সে বছর।
১৯৬২ চিলি(ড্রিংকিং)
১৯৬২ সালের ৭ম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল চিলিতে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে সে বছর বল নিয়ে খুব সমস্যা হয়েছিল। আয়োজক চিলি বল তৈরিতে ইউরোপের মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। যে বল দিয়ে খেলা হয়েছিল সেটি পানি শোষণ করে ভারি হয়ে যেত। পরে অবশ্য ইউরোপের ওই সময়ের সবচেয়ে ভালো বল দিয়ে ফাইনাল খেলা হয়েছিল।
১৯৬৬ ইংল্যান্ড(শ্লাজেনজার)
১৯৬৬ সালের ৮ম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল ইংল্যান্ডে। তখন পর্যন্ত ফিফার কোনো আনুষ্ঠানিক বল যোগানদাতা কোম্পানি ছিল না। স্বাগতিক দেশ ও বিশ্বের নামিদামি কোম্পানির কাছ থেকে বল নেয়া হত। সেখান থেকে বাছাই করে যে কোনো একটি বল দিয়ে খেলা হতো। সে বছর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের ডুয়েসবারির শ্লাজেনজার কোম্পানির তৈরি বল দিয়ে খেলা হয়।
১৯৭০ মেক্সিকো(টেলেস্টার)
১৯৭০ সালের ৯ম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল মেক্সিকোতে। আর সে বছরই প্রথম এডিডাস ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সঙ্গে বল তৈরির চুক্তি করেছিল। ১৯৬২ সালে আমেরিকার ফ্লোরিডায় টেলেস্টার নামে একটি স্যাটালাইট স্টেশন চালু হয়। যেটি আবহাওয়া ও টর্নেডোর পূর্বাভাস প্রচার করে। ওই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার কারণে টেলেস্টার নামটি ব্যবহার করে এডিডাস।
১৯৭৪ জার্মানি(টেলেস্টার ডুরলাস্ট)
১৯৭৪ সালের ১০ম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল জার্মানিতে। আগের বিশ্বকাপের ডিজাইন ঠিক রেখে এডিডাস সেই বল তৈরি করেছিল।
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা(টাঙ্গো)
১৯৭৮ সালের ১১তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল আর্জেন্টিনায়। এডিডাস সে বছর প্রথম ফুটবলের আনুষ্ঠানিক নাম প্রদান করা শুরু করে। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি সে বছর থেকেই এডিডাস ট্রাইঅ্যাডস নামে ট্রেডমার্ক ব্যবহার শুরু করে।
১৯৮২ স্পেন(টাঙ্গো স্পেনা)
১৯৮২ সালের ১২তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল স্পেনে। সে বছর স্পেনের ঐতিহ্য অনুসরণ করে লেদার ও সিনথেটিক দিয়ে এডিডাস তৈরি করেছিল সেই বল। যার গায়ে আবার পলিউরেথেনের প্রলেপ দেয়া হয়েছিল। তখন পর্যন্ত সেই বল ছিল সবচেয়ে আধুনিক।
১৯৮৬ মেক্সিকো(আজতেকা)
১৯৮৬ সালের ১৩তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল মেক্সিকোতে। মেক্সিকোর আজটেক ম্যুরালকে তুলে ধরার জন্য এডিডাস বলে নতুনত্ব এনেছিল। বলটি ছিল পুরোপুরি ওয়াটার প্রুভ।
১৯৯০ ইতালি(এতরাস্কো)
১৯৯০ সালের ১৪তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল ইতালিতে। এডিডাস সেই বলে ইতালির এতরাসকান সিংহের ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলেছিল। আর বলটিতে ছিল পুরোপুরি সিনথেটিক ফাইবার লেয়ার। যা ছিল ওয়াটার টাইট আউট স্কিন দিয়ে মোড়ানো।
১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র(কোয়েস্ট্রা)
১৯৯৪ সালের ১৫তম বিশ্বকাপ ফুটবল আসর বসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এ বিশ্বকাপের বলটি প্রথমে তৈরি করা হয়েছিল ফ্রান্সে। পরে সকল দেশে এটি পালা করে খেলানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছিল এডিডাসের সেই বলে।
১৯৯৮ ফ্রান্স(কোকারেল)
১৯৯৮ সালের ১৬তম বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফ্রান্সে। সে বছর প্রথম রঙিন বল দিয়ে খেলা হয়। তিন রঙের নতুন যে বল এডিডাস তৈরি করেছিল, সেখানে ফ্রান্সের ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছিল। যার প্রতীকী অর্থ ছিল হাই স্পিড ট্রেন ও টার্বাইন।
২০০২ কোরিয়া ও জাপান(ফেবারনোভা)
২০০২ সালের ১৭তম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে। এডিডাস সে বছর ফেবারনোভা নামে যে বল তৈরি করেছিল, সেটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তিনটি রঙে। যেটিতে নিট ফ্যাবরিক, সিনথেটিক ফোম ও ট্রান্সপারেন্ট পলিউরেথান লেয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০০৬ জার্মানি(+টিমজিস্ট)
২০০৬ সালের ১৮তম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয় জার্মানিতে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এডিডাস সে বছর তৈরি করেছিল প্লাস (+) টিমজিস্ট বল। ওই বলে মোট ১৪ টি প্যানেল ছিল। আর বলটি ছিল তখন পর্যন্ত সবচেয়ে গোলাকার বল, যা যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক খেলার জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা(জাবুলানি)
২০১০ সালের ১৯তম বিশ্বকাপ আসর বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে জাবুলানি বল তৈরি করেছিল এডিডাস। জাবুলানি ছিল এডিডাসের ফুটবলের ১১তম সংস্করণ। আর বলটিতে মোট ১১টি রঙ ব্যবহার করা হয়েছিল। যা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু আদিবাসীদের নানান কৃষ্টি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
২০১৪ ব্রাজিল(ব্রাজুকা)
২০১৪ সালের ২০তম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হচ্ছে এডিডাসের তৈরি করা ব্রাজুকা বল দিয়ে। ব্রাজুকা মানে হলো ব্রাজিলিয়ান। এবারের বলে ছয়টি প্যানেল দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার সংস্কৃতি ও মানুষকে তুলে ধরা হয়েছে। ফুটবলের ইতিহাসে এবারের বলটি সবচেয়ে আধুনিক। এতে রিবন ও রঙ দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রচলিত ঐতিহ্যকে তুলে ধরার প্রয়াস নেয়া হয়েছে।
২০১৮ রাশিয়া(টেলস্টার ১৮)
গত নভেম্বর মাসে ফিফা ঘোষণা দিল ২০১৮ বিশ্বকাপের নতুন বলের। ১৯৭০ এর বিশ্বকাপের কথা স্মরণ করেই এই বলের নাম রাখা হয়েছে টেলস্টার। বলটির ডিজাইনও করা হয়েছে সত্তরের সেই বলের মতো করেই। ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মাঠে গড়াবে সাদাকালো ফুটবল। শুধুমাত্র বলের নাম, বিশ্বকাপ ও অ্যাডিডাসের লোগোতে ব্যবহার করা হয়েছে সোনালি রং। সাদা পৃষ্ঠের কালো মোজাইকের মত দেখতে প্যাটার্নগুলো বলটিকে দিয়েছে ক্লাসিক এক রূপ।
এএ




