বছরের শুরুতেই প্রযুক্তি বিশ্বে একটি নতুন নামের এআই এজেন্ট ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কোনো চ্যাটবট নয়, বরং এটি একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্ট’ ওপেনক্ল (OpenClaw)। যা ব্যবহারকারীর ডিভাইসে ইনস্টল থাকলে নিজে থেকেই বেশ কিছু কাজ করতে পারে। পিটার স্টাইনবার্গারের তৈরি এই ফ্রি সফটওয়্যারটি সিলিকন ভ্যালি থেকে চীন পর্যন্ত ডেভেলপারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
চ্যাটভিত্তিক সাধারণ এআইকে প্রম্পট (নির্দেশ) দিলে সে কেবল টেক্সট বা ছবি আকারে সাড়া দেয়। কিন্তু ওপেনক্ল ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন অ্যাপ বা সেবার সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করে দিতে পারে। এটি টেলিগ্রাম, সিগন্যাল, ডিসকর্ড বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমেও পরিচালনা করা যাচ্ছে।
এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে চলে এবং পুরনো কথোপকথন বা কাজের ইতিহাস মনে রেখে সেই অনুযায়ী আচরণ করতে পারে। নির্মাতা পিটার স্টাইনবার্গার একে বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘এটি এমন একটি এআই, যা আসলেই কাজ করে।’
ওপেনক্ল’র শুরুর বিষয়টি বেশ আলোচিত ও ঘটনাবহুল। গত বছরের নভেম্বরে যখন এটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে, তখন এর নাম ছিল ‘ক্লডবট’। পিটার স্টাইনবার্গার মূলত অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’ (Claude) এআই-এর নামানুসারে এর নামকরণ করেছিলেন।
তবে ট্রেডমার্ক বা নাম সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে অ্যানথ্রপিক অভিযোগ তুললে, ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি এর নাম বদলে রাখা হয় ‘মল্টবট’ (Moltbot)। লবস্টার বা গলদা চিংড়ির খোলস বদলানোর থিম থেকে এই নামটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পিটার স্টাইনবার্গারের কাছে নামটি খুব একটা যুতসই মনে হয়নি। তাই মাত্র তিন দিন পর আবার নাম পরিবর্তন করে চূড়ান্তভাবে রাখা হয় ‘ওপেনক্ল’ (OpenClaw)।
হঠাৎ কেন এত জনপ্রিয়তা?
জানুয়ারির শেষের দিকে ওপেনক্ল’র জনপ্রিয়তা হঠাৎ আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল।
প্রথমত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ডেভেলপাররা এটি ব্যবহার ও পরিবর্তন করতে পারছেন। গিটহাবে (GitHub) এটি ১,৪৫,০০০-এর বেশি রেটিং পড়েছে যা সফটওয়্যার জগতেও বিরল।
দ্বিতীয়ত উদ্যোক্তা ম্যাট শ্লিখ্ট ‘মল্টবুক’ নামে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালু করেন, যা বিশেষভাবে এই ধরনের এআই এজেন্টদের জন্য তৈরি। মল্টবুক ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথে ওপেনক্ল’র পরিচিতিও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে চীনে ডেভেলপাররা ওপেনক্ল-কে স্থানীয় ‘সুপার-অ্যাপ’ এবং শক্তিশালী ‘ডিপসিক’ মডেলের সাথে যুক্ত করে এর ব্যবহার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সান ফ্রান্সিসকোতে ক্লকন অনুষ্ঠানের ব্যাকস্টেজে পিটার স্টাইনবার্গার (ডানে)
এবং সহ-উপস্থাপক টোমাস টেইলর (বামে)। ছবি: আরটিভি
নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা:
ওপেনক্ল’র অসীম ক্ষমতার বর্ণনা যেভাবে প্রযুক্তিপ্রেমিরা দিয়েছেন এর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। যেহেতু এটি একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত এজেন্ট’, তাই কাজ করার জন্য একে ইমেইল, ক্যালেন্ডার এবং মেসেজিং অ্যাপের মতো সংবেদনশীল জায়গায় প্রবেশের অনুমতি (একসেস) দিতে হয়।
যদি ব্যবহারকারী সঠিকভাবে এটি সেটআপ করতে না পারেন, তবে ব্যক্তিগত তথ্য বা ইমেইল হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্ক্যাম বা প্রতারণা ফোর্বসের প্রতিবেদন বলছে, ওপেনক্ল’র জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে কিছু ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে, যা ম্যালওয়্যার ছড়াচ্ছে। যেহেতু এটি বিভিন্ন মডিউল ব্যবহার করে, তাই কোনো একটি মডিউল ক্ষতিগ্রস্ত হলে হ্যাকাররা পুরো সিস্টেমে ঢুকে পড়তে পারে।
তাই নিরাপত্তা গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, ওপেনক্ল সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নয়। এটি মূলত ‘পাওয়ার ইউজার’ বা প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন এমন ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত। সংবেদনশীল বা অফিসের মূল অ্যাকাউন্টের সাথে এটি যুক্ত করার আগে ‘স্যান্ডবক্সে’ (বিচ্ছিন্ন পরিবেশ) ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আরটিভি/এমএ





