হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি রোগটি দেখা দেওয়ার পাঁচ বছর আগেই শনাক্ত করতে সক্ষম একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল তৈরি করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা।
বিশ্বজুড়ে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত। এটি এমন একটি অবস্থা, যখন হৃদযন্ত্র শরীরের বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি পূর্ণমাত্রায় দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসকেরা রোগীকে আগেভাগেই নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে পারবেন, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধও করা সম্ভব হতে পারে।
অক্সফোর্ডের গবেষক দলের তৈরি এই এআই টুলটি হৃদযন্ত্রের চারপাশে থাকা চর্বি বা ফ্যাট টিস্যুর সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে। বিশেষ করে সেখানে প্রদাহ বা অস্বাস্থ্যকর অবস্থার যেসব লক্ষণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, সেগুলো এআই শনাক্ত করতে পারে।
গবেষকদের ভাষ্য, এতদিন নিয়মিত কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে নির্ভুলভাবে হার্ট ফেইলিউরের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণের কোনো কার্যকর পদ্ধতি ছিল না। নতুন এই প্রযুক্তি রোগীর জন্য একটি ঝুঁকি স্কোর তৈরি করে, যা চিকিৎসকদের রোগীকে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে বা কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ঝুঁকির রোগীরা সর্বনিম্ন ঝুঁকির রোগীদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় ছিলেন। তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রায় চারজনের মধ্যে একজনের।
ইংল্যান্ডের এনএইচএসের (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) অধীন নয়টি ট্রাস্টের ৭২ হাজার রোগীর তথ্য ব্যবহার করে এই এআই টুলটি প্রশিক্ষণ ও যাচাই করা হয়। রোগীদের সিটি স্ক্যানের পর এক দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পরবর্তী পাঁচ বছরে হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ৮৬ শতাংশ নির্ভুলতায় পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে।
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিনের অধ্যাপক চারালাম্বোস আন্তোনিয়াডেস বলেন, জীববিজ্ঞান ও কম্পিউটিং প্রযুক্তির উন্নয়নকে কাজে লাগিয়ে আমরা হার্ট ফেইলিউর চিকিৎসায় একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের নতুন এআই টুল কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রতিটি রোগীর জন্য একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি স্কোর তৈরি করতে পারে। যদিও এই গবেষণায় কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান ব্যবহার করা হয়েছে, আমরা এখন এমন পর্যায়ে কাজ করছি যাতে বুকের যেকোনো সিটি স্ক্যান থেকেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়, যে কারণেই স্ক্যানটি করা হোক না কেন। এর ফলে চিকিৎসকেরা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য আরও নিবিড় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারবেন।
অক্সফোর্ডের গবেষক দল ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি এনএইচএসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চালুর জন্য নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের আশা, ভবিষ্যতে হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে নিয়মিত কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণের অংশ হিসেবেই এটি যুক্ত হবে।
এই গবেষণায় অর্থায়নকারী ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ডা. সোনিয়া বাবু-নারায়ণ বলেন, হার্ট ফেইলিউর প্রায়ই খুব দেরিতে শনাক্ত হয়, অনেক সময় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরই তা ধরা পড়ে। এতে হৃদপেশিতে গুরুতর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, যা আগেভাগে ধরা পড়লে এড়ানো সম্ভব ছিল। এই টুল চিকিৎসকদের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের আগে থেকেই শনাক্ত করতে এবং আরও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সহায়তা করবে। দ্রুত রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে রোগীর জীবনকাল ও জীবনমান— উভয়ই উন্নত হতে পারে। এই গবেষণা দেখিয়েছে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে হৃদরোগ চিকিৎসায় কীভাবে বড় উন্নতি আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রচুর ফল ও শাকসবজি খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ত্যাগ, মদ্যপান কমানো এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরটিভি/এমএইচজে




