images

মুক্তমত

প্রস্তাবিত বাজেট: ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি নাকি আর্থিক ঝুঁকির নতুন চক্র?

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬ , ০৯:৫১ পিএম

প্রতি বছর জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়, তা হলো—সরকার তার ব্যয়ের সম্প্রসারণ কতটা ঋণনির্ভর করে করছে, এবং সেই ঋণ আদৌ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কি না। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ, এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। 

এই দুইয়ের ব্যবধান, অর্থাৎ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি—যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান—পূরণ করতে হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে। কোনো একক অর্থবছরের ঘাটতির পরিমাণ বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না; বরং প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি গতিবিদ্যাগত কাঠামো, যেখানে ঋণের সুদহার, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার এবং রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা—এই তিনটি চলক পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে তা পরীক্ষা করা। 

বাংলাদেশের উপাত্ত: ঋণ ও ঘাটতির দুই দশকের গতিপ্রকৃতি

বাজেট বক্তৃতায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০৬ সালে সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ষোলো গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো সুদ ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির গতি: ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তেরো গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। 

আরও পড়ুন
5240000

পুঁজিবাদের দাপট বনাম শ্রমের অধিকার: শ্রম আইন কি শুধু কাগজে-কলমে?

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা—অর্থাৎ মোট প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাস করছে এবং উন্নয়নমুখী ব্যয়ের জন্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সংকুচিত করে তুলছে।

বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে আরেকটি কাঠামোগত ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে বিনিময় হারের ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের মাধ্যমে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৬৮ টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ টাকায়। এর অর্থ হলো, বৈদেশিক মুদ্রায় গৃহীত ঋণের নামমাত্র সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সেই ঋণ পরিশোধের প্রকৃত স্থানীয় মুদ্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। 

ডোমার-ব্লাঞ্চার্ড কাঠামোর পরিভাষায় বলা যায়, মুদ্রার অবমূল্যায়ন কার্যকরভাবে r-কে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে, এমনকি যদি ঋণচুক্তির নামমাত্র সুদহার অপরিবর্তিত থাকে। যেহেতু বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ গত দুই দশকে প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর প্রায় সম্পূর্ণটাই মার্কিন ডলার, জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানের মতো বৈদেশিক মুদ্রায় ধার্য, তাই ভবিষ্যতে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হলে—যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও রিজার্ভের ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব নয়—ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা নামমাত্র পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হারের চেয়েও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।

ডোমারের কাঠামোয় এই তথ্যকে স্থাপন করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে r বনাম g সম্পর্কটি বাস্তবে কেমন? প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে, যেখানে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ—ফলে নামমাত্র (nominal) প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় মোটামুটি চৌদ্দ শতাংশের কাছাকাছি, যা আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে—২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫.৭৮ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। 

আরও পড়ুন
8745633

এইচএসসি ২০২৬: পরীক্ষার কৌশল, পরিমিত পরিকল্পনা ও নিয়মিত অনুশীলন

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর প্রযোজ্য কার্যকর সুদহার ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় রয়েছে; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ইতোমধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও না পৌঁছায়, এবং সুদহার উচ্চ থাকে, তাহলে কার্যকরভাবে r, g-কে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়—যা ব্লাঞ্চার্ডের সতর্কবার্তা অনুযায়ী ঠিক সেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যেখানে ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ একটি স্ব-শক্তিশালী ঋণাত্মক চক্রে পরিণত হতে পারে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণস্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও এই উদ্বেগের প্রতিফলন স্পষ্ট—বাংলাদেশের ঋণমান ইতিমধ্যে ‘নিম্ন’ ঝুঁকি শ্রেণি থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির শ্রেণিতে অবনমিত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৭৩ শতাংশে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা; মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক, অর্থাৎ ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এই দুর্বলতা সরকারের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণকে আরও ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, কারণ দুর্বল মূলধন কাঠামোর ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ড কেনার সক্ষমতা হারাতে পারে অথবা উচ্চ সুদ দাবি করতে পারে, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার (crowding-out) ঝুঁকিও তৈরি হয়। 

উল্লেখ্য, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫ শতাংশে—এই পতন আংশিকভাবে সরকারি ঋণগ্রহণের সম্প্রসারণজনিত সংকোচন প্রভাবেরও ফল বলে অনুমান করা যায়। প্রস্তাবিত বাজেটে অবশ্য ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণগ্রহণের পরিমাণ চলতি অর্থবছরের ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা থেকে সামান্য কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যদিও এর মাত্রা সামগ্রিক কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট নয়।

গুণগত মান বনাম পরিমাণগত সম্প্রসারণ

কেইনসীয় গুণিতক তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে প্রস্তাবিত বাজেটে একটি ইতিবাচক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়: উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তত্ত্বগতভাবে এটি ইতিবাচক, কারণ উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অধিকতর উৎপাদনশীল এবং তার গুণিতক প্রভাব পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় শক্তিশালী বলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়।

তবে এখানে একটি বাস্তবতা-নির্ভর সতর্কতা অপরিহার্য: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪০.৭ শতাংশ, এবং সামগ্রিক বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সংশোধিত বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ। 

অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ব্যয়-বরাদ্দের অনুপাত পরিবর্তিত হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ঘোষিত উন্নয়নমুখী ব্যয়-কাঠামো বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত গুণিতক প্রভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হতে পারে—আর তখন গৃহীত ঋণ কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায় হিসেবেই থেকে যাবে, প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব আহরণের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যা ডোমার-ব্লাঞ্চার্ড কাঠামোয় ঘাটতি অর্থায়নের স্থায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে ছিল, যদিও আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। রাজস্ব আহরণে এই ধরনের ক্রমাগত ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সরকারকে প্রতি বছর ঘাটতি অর্থায়নের জন্য আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ধীরে ধীরে ঋণ-জিডিপি অনুপাতকে একটি স্ব-শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী চক্রে ঠেলে দিতে পারে—বিশেষত যখন একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বারবার অর্জিত হয় না।

আরও পড়ুন
mnc

মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি

এই দুই দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাব—রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সংকট—একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায় কেন কেবল বাজেটের আকার বা ঘাটতির শতাংশিক হার দেখে ঋণস্থিতিশীলতা বিচার করা যথেষ্ট নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন-সক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে।

ঋণস্থিতিশীলতা বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি সূচক হলো রাজস্ব আয়ের তুলনায় সুদ ব্যয়ের অনুপাত (interest-to-revenue ratio), যা প্রকৃত আর্থিক চাপের একটি সরাসরি পরিমাপক, কারণ সরকারকে শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকেই সুদ পরিশোধ করতে হয়, জিডিপি থেকে নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট সুদ ব্যয় প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যেখানে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা—অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রায় ১৮ শতাংশ ইতিমধ্যেই কেবল পূর্ববর্তী ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয়িত হচ্ছে, উন্নয়ন বা সামাজিক ব্যয়ে পৌঁছানোর আগেই। 

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, এই অনুপাত যখন ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী থাকে এবং কুড়ি শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি পৌঁছে যায়, তখন তা সাধারণত একটি সতর্কীকরণ সংকেত (early warning signal) হিসেবে বিবেচিত হয়—কারণ এর অর্থ হলো নতুন রাজস্ব আয়ের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ অতীতের সিদ্ধান্তের দায় মেটাতেই নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যৎমুখী বিনিয়োগে নয়। ডোমারের মূল মডেলে অন্তর্নিহিত আরেকটি অনুমান হলো ঋণের অবিচ্ছিন্ন পুনঃস্থাপন (rollover) সম্ভব—কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা পুনঃস্থাপন-ঝুঁকি (rollover risk) বাড়িয়ে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড বা সুকুকের মতো দীর্ঘ-মেয়াদি অর্থায়ন উপকরণের দিকে কাঠামোগত স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।
 
ডোমার ও ব্লাঞ্চার্ডের তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে যে মূল শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—ঋণের নিরঙ্ক পরিমাণ নিজে কোনো চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সুদহার ও প্রবৃদ্ধির হারের আপেক্ষিক গতিপ্রকৃতি, এবং ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণগ্রহণ সামান্য সংকোচনের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা সঠিক দিকনির্দেশনা বহন করে। কিন্তু প্রকৃত প্রবৃদ্ধি যদি লক্ষ্যমাত্রা থেকে বারবার পিছিয়ে পড়ে, সুদহার উচ্চ থাকে, এবং বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি অব্যাহত থাকে, তাহলে আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের আড়ালে একটি দুর্বল ঋণগতিবিদ্যা ক্রমেই দানা বাঁধতে থাকবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কেবল ব্যয়-বরাদ্দের অনুপাত পরিবর্তন করাই নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা—এই দুটি পরস্পর-সংযুক্ত কাঠামোগত দুর্বলতা—একযোগে মোকাবিলা করা যাতে ঋণনির্ভর রাজস্ব সম্প্রসারণ একটি আত্মঘাতী চক্রের পরিবর্তে প্রকৃত অর্থেই একটি টেকসই প্রবৃদ্ধি-চক্রে রূপান্তরিত হয়।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

আরটিভি/এমএম