এইচএসসি ২০২৬: পরীক্ষার কৌশল, পরিমিত পরিকল্পনা ও নিয়মিত অনুশীলন

মোঃ ওবায়দুল্লাহ্ নয়ন

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ , ০৯:০২ পিএম


এইচএসসি ২০২৬: পরীক্ষার কৌশল, পরিমিত পরিকল্পনা ও নিয়মিত অনুশীলন
অধ্যক্ষ মো. ওবায়দুল্লাহ্ নয়ন। ছবি: সৌজন্য

 উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ পরীক্ষার ফলাফল কেবল ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগই তৈরি করে না, বরং শিক্ষার্থীর অধ্যয়নশৈলী, মনোযোগ, বোধশক্তি ও মানসিক দৃঢ়তারও প্রতিফলন ঘটায়। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শুধু উচ্চ নম্বর অর্জনের লক্ষ্য নয়, বরং বিষয়বস্তুর গভীর উপলব্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

আরও পড়ুন

আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ডা. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের অধ্যক্ষ মো. ওবায়দুল্লাহ্ নয়ন। তাঁর পরামর্শগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—

পরীক্ষা সন্নিকটে কিন্তু সময় বাকি অল্প সেহেতু পড়াশোনার ধারা পরিবর্তন করা উচিত। শুধুমাত্র বারবার পড়ে মুখস্থ করা বা ‘প্যাসিভ রিডিং’ ফলপ্রসূ হয় না। তাই দুটি আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে: 

সক্রিয় স্মৃতিচারণ (Active Recall): কোনো অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করো-“আমি কী পড়লাম?” নিজের ভাষায় উত্তরটি বলার চেষ্টা করো। যদি বলতে না পারো, তবে বই খুলে দেখো। মস্তিস্ককে দিয়ে তথ্য মনে রাখার জন্য কাজ করিয়ে নাও।

বারবার পুনরাবৃত্তি (Repetition): আজ যা পড়েছ, তা পরের ২৪ ঘণ্টা পর, তারপর এক সপ্তাহ পর এবং পরীক্ষার পূর্বে পুনরায় রিভিশন দাও। নির্দিষ্ট ব্যবধানে পড়লে তথ্য দীর্ঘসময় মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে।

MCQ-এ দক্ষতা: 
২৫-৩০ নম্বরের নিশ্চিত সাফল্য এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউ অংশ। সৃজনশীল প্রশ্নে নম্বর কমে গেলেও এমসিকিউতে পূর্ণ নম্বর পাওয়া গেলে ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই ভালো হয়।

MCQ-এ ভালো করতে হলে:
পাঠ্যবইকে প্রধান আস্থায় রাখো। সহায়ক বই বা নোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলো। এমসিকিউর বেশিরভাগ প্রশ্ন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইয়ের পাশের ছোট খাতা, ছবির নিচের লেখা এবং প্যারাগ্রাফের শেষ বাক্যগুলো থেকে তৈরি হয়। টেস্ট পেপার থেকে ভালো কলেজগুলির MCQ অনুশীলন করে সমাধান করো।

বিলোপন পদ্ধতি (Elimination Method): পরীক্ষার খাতায় কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে অন্ধভাবে অনুমান করো না। চারটি অপশনের মধ্যে যেগুলো একদম অসম্ভব বা বিভ্রান্তিকর, সেগুলো আগেই বাদ দিয়ে দাও। অনেক সময় দুটি অপশন একেবারে বিপরীত থাকে, তখন সঠিকটি ধরা সহজ হয়।

নিয়মিত অনুশীলন এবং বিশ্লেষণ: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বহুনির্বাচনী প্রশ্নের অনুশীলন করো এবং ভুলগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করো। এতে পরীক্ষার হলে দ্রুত উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা বা ‘স্পিড অ্যাক্যুরেসি’ বাড়বে।

প্রতি অধ্যায় শেষে বোর্ড বইয়ের সব MCQ এবং পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন অনুশীলন করো।

ভুল উত্তরের কারণ বিশ্লেষণ করো।

সায়েন্স: সূত্র, প্রক্রিয়া ও গাণিতিক MCQ-তে জোর দাও। 

ব্যাবসায় শিক্ষা: হিসাব, সংজ্ঞা ও প্রয়োগভিত্তিক বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দাও।

মানবিক: তথ্য, কারণ-ফলাফল ও সমসাময়িক উদাহরণভিত্তিক তথ্যগুলির উপর গুরুত্ত দাও।

পরীক্ষাকক্ষের তিন ঘণ্টা: কৌশলগত পরিকল্পনা

প্রস্তুতি ভালো থাকলেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পেরে ব্যর্থ হয়। একজন দক্ষ প্রতিযোগীর মতো এই তিন ঘণ্টা তোমাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে হবে। অভিজ্ঞদের মতে এই তিন ঘণ্টাকে তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ভাগ করা উচিত:

প্রথম ধাপ: পর্যবেক্ষণ ও মানসিক মানচিত্র তৈরি (প্রথম ১০ মিনিট):
প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই লেখা শুরু করো না। প্রথমে পুরো প্রশ্নপত্রটি একবার গভীরভাবে পড়ে নাও। কোন প্রশ্নগুলো তোমার কাছে সহজ মনে হচ্ছে, কোনগুলো মাঝারি এবং কোনগুলো কঠিনÑতা চিহ্নিত করো। মনে মনে একটি ক্রম বা সিকোয়েন্স ঠিক করে নাও কোন প্রশ্নটি আগে এবং কোনটি পরে উত্তর দেবে। এটি তোমার মানসিক প্রস্তুতি শক্ত করবে এবং দুশ্চিন্তা কমাবে। MCQ-এর ক্ষেত্রে 'অনিশ্চিত বা পারা' প্রশ্নে অতিরিক্ত সময় ব্যায় করো না ।

দ্বিতীয় ধাপ: 
কার্যকরী লেখন ও বিষয়বস্তু উপস্থাপন (পরবর্তী ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট):
সহজ থেকে কঠিনের ধারা: আগে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও যা তোমার নখদর্পণে অর্থাৎ সবচেয়ে সহজ। এতে তুমি দ্রুত নম্বর নিশ্চিত করবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
উত্তর না জানা প্রশ্নে করণীয়: কোনো প্রশ্নে আটকে গেলে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করো না। তা ফাঁকা রেখে পরের প্রশ্নে চলে যাও। শেষে সময় পাওয়া গেলে সেগুলোর দিকে ফিরে আসবে।
কাঠামোবদ্ধ উত্তর: উত্তর লেখার সময় ভূমিকা, মূল অংশ এবং উপসংহারÑএই কাঠামো মেনে লিখলে পরীক্ষকের পড়া সহজ হয়। প্রয়োজনে মূল অংশের তথ্যগুলো বিন্দু বা ছোট অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করো। পরীক্ষক সহজে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা তারিখ এবং সূত্র আন্ডারলাইন করে দিতে পারো।

তৃতীয় ধাপ: পর্যালোচনা করা (শেষ ২০ মিনিট):
সবশেষে ৫-১০ মিনিট খাতা দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখে নাও কোনো প্রশ্ন বাদ পড়েছে কি না, এবং বানান বা গাণিতিক ভুল আছে কি না। কোনো প্রশ্নের ক্রমিক নম্বর বা সেট কোড ঠিক আছে কি না তা দেখে নাও। অনেক সময় ছোট ভুলেও অনেক নম্বর কাটা যায়, তাই সতর্কতার সাথে রিভিউ করা অত্যন্ত জরুরি ।

বিশেষ সতর্কতা:

তোমাদের হাতে এখনো যেটুকু সময় রয়েছে, এই সময়টাকে নষ্ট না করে সাজিয়ে নিতে হবে। দিনের শুরুতে মস্তিস্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, তাই সকালে কঠিন বিষয়গুলো (যেমন অংক বা বিজ্ঞান) এবং শেষের দিকে তুলনামূলক সহজ বিষয়গুলো (যেমন সাহিত্য বা গল্প) পড়ার তালিকায় রাখো। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট বিরতি নিয়ে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দাও। 

মনে রাখবে, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস তোমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। পরীক্ষার চাপে বা উদ্বেগে নিজেকে ভেঙে পড়তে দেবে না। মানসিক চাপ বা উদ্বেগ তোমাদের শক্তি ক্ষয় করে। পরিবারের সদস্য বা শিক্ষকদের সাথে তোমাদের মনের কথা শেয়ার করো। এ সময় পিতা-মাতা-অভিভাবকদের তাদের সন্তানের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও মনোবলের দিকে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে । শিক্ষার্থীদেরকে পারিবারিক সমস্যা বা দায়িত্ব থেকে দূরে রেখে, যথাযথ পাঠের পরিবেশ নিশ্চিত করে, তাদেরকে মানসিকভাবে ভরসা ও সাহস যোগাতে হবে ।

অসচেতনভাবে একদিন বৃষ্টিতে ভিজেও যদি তোমরা জ্বর-সর্দি বা কাশিতে আক্রান্ত হও, তাহলে মহামূল্যবান কয়েকটি দিনের তোমাদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে । এছাড়াও ডেঙ্গু, হাম, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি রোগের ব্যাপারে যাবতীয় প্রতিকারমূলক ব্যাবস্থা গ্রহণ ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মোবাইল গেমস তোমার মূল্যবান সময় এবং মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে। এগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখো। 

পরীক্ষার খাতায় সেট কোড, রেজিস্ট্রেশান নম্বর বা রোল নম্বর পূরণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করো ।

পরীক্ষার রুটিন যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে । ভুল তারিখে ভুল বিষয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ কিংবা পরীক্ষার সময় নিয়ে যেন কোন বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী যে সকল বিষয়ের পূর্বে বিরতি কম, সে সকল বিষয়ের পড়াশুনা পরীক্ষা শুরুর আগেই সম্পন্ন করে রাখতে হবে।

কোন কারণবশত একটি পরীক্ষা আশানুরূপ ভালো না হলে, হতাশ না হয়ে, পূর্ণ মনোবল নিয়ে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে।

সফলতা অর্জনের পথ কখনো সহজ হয় না, কিন্তু ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং সঠিক পরিকল্পনা তোমাদেরকে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেবে।  

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission