সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুননশিল্পীদের এখন দুর্দিন যাচ্ছে। শীতলপাটির একমাত্র উপকরল মুর্তা বেতের চাষ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। অথচ একসময় সিলেট বিভাগে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়নি শীতলপাটি ছাড়া। সৌখিনতার প্রতীক ছাড়াও নকশি কারু খচিত শীতলপাটি উন্নত রুচি ও আভিজাত্যের একটি পণ্য।
বেতের সংকট এবং পর্যাপ্ত পৃষ্টপোষকতার অভাবে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের প্রায়ই অর্থনৈতিক সংকট আর টানাপড়েনের মধ্যে চলছে জীবন। তবুও জীবিকার তাড়নায় কোনোমতে আঁকড়ে আছেন বাপ-দাদার পুরনো এই পেশা।
শীতলপাটির কদর সিলেট বিভাগ ছাড়াও দেশ-বিদেশে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে শীতলপাটি বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে। এতে সরকার পাবে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব। পাশাপাশি বেকারদের হবে কর্মসংস্থান। শীতলপাটির উপকরণের অপ্রতুলতায় অধিকমূল্যে মুর্তা ক্রয় করতে একটি শীতলপাটি বুনতে যে পরিমাণ খরচ হয় সে অনুপাতে মূল্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ শীতলপাটি শিল্পীদের।
সরেজমিনে মৌলভীবাজারের বড়লেখার তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর-সংলগ্ন নিভৃত পল্লী পশ্চিম গগড়া গ্রামে বীরেশ দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় বসে শীতলপাটি তৈরি করছেন বীরেশ দাস। তার নিপুণ হাতে পাটিতে উঠছিল বাহারি রঙের নকশা। পাটিতে বাহারি নকশা তুললেও বীরেশ দাসের মনে কোনো আনন্দ নেই। রাত-দিন পরিশ্রম করে আর্থিক স্বচ্ছলতা না আসায় মনে কোনো আনন্দ নেই। ভীষণ অর্থনৈতিক সংকট আর টানাপোড়েনের মধ্যে চলছে তার সংসার। অন্য কিছু করার সুযোগ নেই। তাই জীবিকার তাড়নায় কোনোমতে আঁকড়ে আছেন বাপ-দাদার পেশা।
বীরেশ দাস আরটিভি নিউজকে বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে পাটি তৈরি করছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো লাভ নেই, বেতও পাওয়া যায় না। বেতের দাম দিয়ে পাটি তৈরি করে সংসার চালানো যায় না। অন্য কোনো কাজ জানি না তাই এই কাজ করি। যারা কাজ পারেন, লেখাপড়া শিখেছেন তারা চাকরি করছেন। বিদেশে গেছেন। তাদের স্বচ্ছলতা এসেছে।
বেতের শীতলপাটি তৈরি কেবল বীরেশে দাসের পারিবারিক পেশাই নয়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও খুটিরশিল্পের অংশও এটা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের এই শীতল পাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। তবে এ ঘোষণা দেওয়ার পরে ভাগ্য ফিরেনি শীতলপাটির শিল্পীদের। কাঁচামাল সংকট ও নায্যমূল্য না পাওয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। যুগ যুগ ধরে পাটি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও নায্যমূল্য না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে অনেকে এই পেশা ছেড়েছেন। তবে ঐতিহ্য হিসেবে বীরেশের মতো হাতেগোনা কিছু পরিবারে এখনও টিকে আছে পাটি শিল্পে। টানাপোড়নই যাদের জীবন সঙ্গী।
গগড়া গ্রামের পাটিশিল্পী মানিক দাস বলেন, আগে ১৬ ভাগ মানুষই পাটি তৈরি করতো, এখন আছে দুই ভাগ। অন্য কাজ পাইলে আমিও পাটি তৈরি করা ছেড়ে দিতাম। সরকারি সহযোগিতা পেলে কিছু স্বচ্ছলভাবে আমরা কাজ করতে পারতাম। শীতলপাটির প্রধান উপকরন মুর্তাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধ করে সুক্ষ ও মসৃণ আঁশ বের করে শীতলপাটি বুনতে হয়। বুননের সময় বিভিন্ন ডিজাইন করার জন্য পছন্দমত রঙের মধ্যে বেতকে চুবিয়ে নেওয়া হয়। সুক্ষ ও মসৃণ ৭ ফুট দৈঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের একটি শীতলপাটি বুনতে একজন দক্ষ কারিগরের সময় লাগে ৪ থেকে ৫ মাস।
উন্নত ও সুক্ষ শীতলপাটির মূল্য দেড় হাজার থেকে ২৫ হাজার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বলে শীতলপাটির এক ব্যবসায়ী জানান। এসব শীতলপাটি যত্নসহকারে ব্যবহার করলে ২৫ থেকে ৩০ বছরেও নষ্ট হয় না। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মাপ ও নামের শীতলপাটি বুনা হয়। যেমন নয়নতারা, আসমানতারা, জোড়াকেচিরা, সিকি, আধুলি, টাকা ইত্যাদি।
এসব নাম ছাড়াও বিভিন্ন আকৃতি ও বৈচিত্র্য ভরপুর শীতলপাটি শহর ও গ্রামের বাজারে পাওয়া যায়। অতীতে মসজিদ ও বিয়ে বাড়িতে শীতলপাটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু যুগের বিবর্তনে এখন আর শীতলপাটি ব্যবহার না করে কার্পেট ও ডেকোরেটার্সের আসবাবপত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বাড়তি আরাম আয়েশের জন্য শীতলপাটি এখনও অভিজাত পরিবারগুলোতে দেখা যায়। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সুক্ষ ও মসৃণ শীতলপাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অপ্রতুল।
শীতলপাটি হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বনাঞ্চল। প্রাকৃতিকভাবে বনবিভাগের জমিতে মুর্তা চাষ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। গাছ ও বাঁশ মহালের মত মুর্তার মহাল থেকে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের শীতলপাটি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মুর্তা ক্রয় করেন। অনেকে নিজেদের ক্ষুদ্র পরিসরে মুর্তা চাষ করলেও চাহিদার তুলনায় নগণ্য। ফলে মহাল থেকে মুর্তা ক্রয় করতে হয়। বর্তমানে সিলেটের ছাতক বনরেঞ্জের অধিনে ২০০ একর পতিত জমিতে মুর্তা বনায়ন করেছে বন বিভাগ। বন বিভাগের এ উদ্যোগ শীতলপাটি হস্তশিল্পের জন্য সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে।
সিলেট ছাড়াও মৌলভীবাজারের রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া উপজেলায় শীতলপাটি হস্তশিল্প রয়েছে। বিশেষ করে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হিন্দু সম্প্রদায়ের দাসগোত্র। বর্তমানে এ পেশায় মুসলমানদের কুটির শিল্পে দক্ষ ব্যক্তিরাও জড়িত রয়েছে।
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী আরটিভি নিউজকে বলেন, পাটি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এর সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণের দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে তাদের আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা ও বাজার ধরে রাখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এক্সপোর্ট মার্কেটে যাতে যেতে পারে সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে শিল্পটাকে ধরে রাখে। তাই তরুণদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।





