ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতিও রূপ বদলায়। আর সেই সূত্র ধরেই চলনবিল কখনও থৈ থৈ পানিতে টইটুম্বুর মাছের ভান্ডার, কখনও মাঠজুড়ে ফসলে ভরা সবুজের সমারোহ কখনও মাঠজুড়ে হলুদের সমারোহ আবার কখনও পাখির কলরবে মুখর এখানকার পরিবেশ।
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত চলনবিল এখন নানা অতিথি পাখির কলরবে মুখরিত। প্রতি বছরের মতো এবারও খাবারের সন্ধানে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে নানা রুপ বৈচিত্র্যের পাখি। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মিঠা পানির মাছের সন্ধানে এসব অতিথি পাখির সমাগম হয়েছে বিলটিতে। শীত মৌসুমে অতিথি পাখির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল। বিলে পাখিদের কোলাহল, কলরব, ডানা মেলে অবাধ বিচরণ সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। অতিথি পাখিদের আগমনে পুরো চলনবিল এখন দৃষ্টিনন্দন এলাকা।
‘চলনবিলের ইতিকথা’ এবং ‘জেলা পাবনার ইতিহাস’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগের ৬ জেলার ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিল চলনবিল। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরের তিন জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বৃহত্তর চলনবিল। বিলে রয়েছে ২১টি নদ-নদী, ৭১টি নালা-খাল ৯৩টি ছোট বিল। ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিলে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫’শ বর্গ মাইলের বেশি। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে চলনবিলের আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি জমে থাকে। যদিও অনেকগুলোর অস্তিত্ব এখন আর নেই।

সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরে চলনবিল থেকে পানি নামতে শুরু করে। এ সময় খাবার সংগ্রহের জন্য চলনবিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বক, কানা বক, ইটালি, শর্লি, পিয়াজ খেকো, ত্রিশুল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাঁদোখোচা, ফেফি, ডাহুক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামকৈলসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির ঝাঁকে ঝাঁকে আগমন করছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এই সকল পাখি চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে ও গাছে অবস্থান করে। তবে কিছু দেশি প্রজাতির পাখি সবসময় থাকে এই বিলে। সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও অতিথি পাখি আসে এই চলনবিলে।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে পাখিপ্রেমীরাও হরেক রকম পাখি দেখতে আসছেন এ বিলে। চলনবিলে সাধারণত হারগিলা, ভাঁড়ই, ছোট সারস, শালিক, চড়ুই, বড় সারস, কাঁদোখোঁচা, নলকাক, ডাহুক, হুটটিটি, চখাচখি, বুনোহাঁস, রাতচোরা, বালিহাঁস, বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। তবে এ বছর বালিহাঁস, বক ও রাতচোরা প্রজাতির পাখি বেশি দেখা মিলছে।কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু পাখি শিকারি এ সুযোগে জাল, বিষটোপ, কারেন্ট জাল, বিভিন্ন ধরনের ফাঁদে প্রাণ দিচ্ছে বিভিন্ন জাতের পরিযায়ী পাখি ও খাঁচার মাধ্যমে অতিথি পাখি শিকার করছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
প্রত্যন্ত বিলাঞ্চল থেকে শিকার করা এসকল পাখি বারুহাঁস, বস্তুল, দিঘরীয়া, গুল্টা, রানীরহাট, বিনসাড়া, ভাদাস, নাদোসৈয়দপুর, গুরুদাসপুর, কাছিকাটাসহ বেশ কয়েকটি বাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি বক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, রাতচোরা ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা জোড়া, বালিহাঁস ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। তবে ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দণ্ডের বিধান থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই।
পরিবেশবিদরা জানান, পাখিরা শুধু প্রাকৃতিক শোভা বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের উপকার করে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র আইন অমান্য করে পরিযায়ী পাখি শিকারে তৎপর হয়ে উঠেছে।এমনটা চলতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর নাটোরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, এগুলো আমাদের কাজ নয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর আছে আপনারা তাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
পাবনা জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা বলেন, পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণ ও পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আরটিভি/এমএ




