চাঁদা না পেয়ে পুলিশি পাহারার মধ্যেই ব‍্যবসায়ীর বাসায় মুহুর্মুহু গুলি

আরটিভি নিউজ

রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬ , ১০:১২ এএম


চাঁদা না পেয়ে পুলিশি পাহারার মধ্যেই ব‍্যবসায়ীর বাসায় মুহুর্মুহু গুলি
ছবি: সংগৃহীত (সিসিটিভি ফুটেজ থেকে)

চট্টগ্রামে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি করেছেন সন্ত্রাসীরা। অথচ, তখন ওই ব্যবসায়ীর নিরাপত্তার জন্য পাহারায় ছিল পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় এই হামলা ঘটে। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান এ হামলার ঘটনায় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে এ হামলা চালিয়েছেন সাজ্জাদের অনুসারীরা।

এর আগে, গত ২ জানুয়ারিও ওই একই বাসায় গুলি করেছিলেন সন্ত্রাসীরা। এরপর থেকে পুলিশের পাহারায় ছিল বাসাটি। এবার পুলিশের পাহারার মধ্যেই বাসাটিতে হামলা হলো। এতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর পরিবারসহ এলাকার লোকজনের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরেই তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছেন। প্রথমে ১০ কোটি টাকা, পরে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন সাজ্জাদ। এই চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারিও তার বাসায় গুলি করা হয়েছিল। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেন সাজ্জাদ। এতে লেখা হয়—‘ওয়েট অ্যান্ড সি’।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সকালে নামাজ পড়ে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ বাসার পেছনে মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা গুলি করতে থাকে। ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করেছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের দেখতে পেয়ে বাসার পাহারায় থাকা পাঁচ থেকে ছয়জন পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি জানায়। পুলিশ সদস্যরা বাসার দোতলায় উঠে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে, এর আগেই সন্ত্রাসীরা চলে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে পিস্তল, চায়নিজ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল।

ঘটনার বিষয়ে মামলা করেছেন কি না, এমন প্রশ্নে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মামলা করে কী হবে। পুলিশ আছে, এর মধ্যে গুলি করেছে।’

বিজ্ঞাপন

এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে উপস্থিত হন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন তারা। 

সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজনের হাতে চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজনের হাতে শটগান ছিল।

হামলার খবর পেয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের একটি দল। পরিদর্শন শেষে হোসাইন কবির ভূঁইয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তার লোকজন দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অস্ত্রধারীরা মুখোশধারী হওয়ায় তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এ ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

কে এই বড় সাজ্জাদ

নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস পেলেও নগরের অপরাধজগতে তাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।

২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে ছাড়েন দেশ। এর পর থেকে বিদেশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন নিজের বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পেয়ে যান সাজ্জাদ।

শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে তার বাহিনী। পরবর্তীতে ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্যও বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।

আরও পড়ুন

পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ নিয়ন্ত্রণ করছেন চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায়ও আছেন এই বড় সাজ্জাদ। তালিকা অনুসারে তার নাম সাজ্জাদ খান।

পুলিশ জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। আধিপত্য বজায় রাখতে তারা কখনো নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন; আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করছেন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন বুড়ির নাতি খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর এই বাহিনীর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে। এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।

আরটিভি/এসএইচএম

 

 

 

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission