হবিগঞ্জের মাধবপুরে উপকারী ও নির্বিষ একটি দাঁড়াশ সাপ হত্যা করে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ নিয়ে বন্যপ্রাণীপ্রেমী ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
রোববার (৮ মার্চ) উপজেলার ধর্মঘর ইউনিয়নের মেহেরগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামের কয়েকজন যুবক প্রায় ৭ থেকে ৯ ফুট লম্বা একটি দাঁড়াশ সাপ পিটিয়ে হত্যা করে। পরে শাহ আলম হৃদয় নামে এক যুবক সাপের ছবিসহ ঘটনাটি ফেসবুকে পোস্ট করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়।
হবিগঞ্জের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সাবরিনা শিমু বলেন, এভাবে নির্বিষ সাপ হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ছবি প্রকাশ করাও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী।
তবে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করা শাহ আলম হৃদয় জানান, সাপটি তিনি হত্যা করেননি। তিনি শুধু ঘটনাটি ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, প্রথমে তিনি এটিকে বিষধর সাপ মনে করেছিলেন, পরে জানতে পারেন এটি দাঁড়াশ সাপ।
স্বেচ্ছাসেবী বন্যপ্রাণী সংগঠন পাখি প্রেমিক সোসাইটির যুগ্ম আহ্বায়ক বিশ্বজিৎ পাল বলেন, দাঁড়াশ সাপ কৃষকের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এরা ইঁদুর খেয়ে কৃষকের ফসল রক্ষা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ ধরনের উপকারী সাপ হত্যা করা পরিবেশ ও কৃষির জন্য ক্ষতিকর এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে দাঁড়াশ সাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ও তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা জানান, দাঁড়াশ নির্বিষ সাপ। এটি সমান দক্ষতায় গাছে উঠতে, সাঁতার কাটতে বা দ্রুত ছুটতে সক্ষম। এ প্রজাতির সাপের মধ্যে লড়াই বাঁধলে এরা পরস্পরের দেহকে পেঁচিয়ে ঊর্ধ্বমুখী উঠতে থাকে। এ সময় দারুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিষয়টি সাপের যুদ্ধ নাচ (combat dance) নামে পরিচিত। সাপটির পোষ মানার রেকর্ডও রয়েছে।
তিনি বলেন, দাঁড়াশ সাপের লেজের কাঁটায় বিষ আছে এবং লেজের আঘাতে মানুষ মারা যায় এমন কথা শোনা যায়। এটি সম্পূর্ণ গুজব। এ ছাড়া সাপটি রাতে গাভীর বাট চুষে দুধ খায় বলেও একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই সাপ ইঁদুর, ছুঁচো ও ব্যাঙ খেয়ে কৃষকের উপকার করে। তাই সাপটিকে কৃষকের বন্ধু বলা হয়। আসলে দাঁড়াশ খুবই নিরীহ প্রকৃতির সাপ। সাধারণত কাউকে কামড়ায় না। তাছাড়া বিষ না থাকায় কামড় দিলেও কোনো ক্ষতি হয় না।
মৃত সাপের ছবি দেখে দুঃখ প্রকাশ করে জোহরা মিলা বলেন, ইঁদুর প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট করে। শুধু এই সাপটি বাঁচিয়েই ইঁদুরের বিশাল ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মানুষের ভুল ধারণার কারণেই উপকারী এই সাপটি হারিয়ে যেতে বসেছে। কৃষকের একান্ত উপকারী বন্ধু হিসেবে সাপটি রক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরপত্তা) আইন-২০১২ এর তফসিল-১ অনুযায়ী সাপটি সংরক্ষিত। তাই এটি হত্যা বা এর কোনো ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
আরটিভি/আইএম





