সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরা। গাড়ির ভাঙা নানা অংশের সঙ্গে পড়ে আছে কয়েক জোড়া জুতা-স্যান্ডেল। এর মাঝেই নজরে পড়ে একটি শিশুর চুষনি। শুক্রবার (১৩ মার্চ) বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকার খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দেখা যায় এ দৃশ্য। এখানেই বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসটিতে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকে।
দুর্ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক লোকজন এখনও ভিড় করছেন ঘটনাস্থলে। আশেপাশে পুরো এলাকায় শোক ও হতবিহ্বল পরিবেশ। যারা দেখছে এসেছেন, তাদের কারো কারো চোখে অশ্রু আর মুখে স্তব্ধতা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নৌ-বাহিনীর বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে চার জনই শিশু। যাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। মারা গেছেন তাদের মায়েরাও। গাড়িতে শিশু সন্তানদের শান্ত রাখতে মা হয়তো তাদের চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। বিয়ে উপলক্ষে বর ও কনের পরিবারের স্বজনেরা হয়তো কিনেছিলেন নতুন জুতো। কিন্তু এখন মা-সন্তান কিংবা বিয়ের আনন্দে মেতে থাকা যাত্রীরা কেউই আর নেই এই পৃথিবীতে।
ঘটনাস্থলের অদূরে রফিকুল ইসলামের বাড়ি। শুক্রবার সকালে তাকে দেখা গেল, গভীর মনোযোগ দিয়ে রাস্তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরো জুতো ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির দিকে তাকিয়ে থাকতে। কী ঘটেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখি নাই। আমার চোখের সামনেই বলা চলে। মাঠে গরু রেখে ঘরে ফিরছি মাত্র। হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ। প্রথমে ভেবেছি গরুটা হয়ত বাসের সামনে পড়েছে। পরে দেখি দুই গাড়ির সংঘর্ষ। রক্ত আর মরা মানুষ। একসঙ্গে এত আহত মানুষ সরাসরি আগে কখনো দেখিনি।
রফিকুলের মত স্থানীয় অনেকই ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের পরিবারের কথা স্মরণ করে সমবেদনা প্রকাশ করছেন।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের সঙ্গে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের মার্জিয়া আক্তার মিতুর বিয়ে হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে নববধূ মিতু নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় বর ও কনে এবং মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের প্রাণ যায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে রাজ্জাকের বাড়ির গন্তব্য ছিল মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে।
বরের পক্ষের নিহতরা হলেন- বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম।
শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। আর কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।
তারা হলেন- কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম।
নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
সকালে হাঁটতে হাঁটতে শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে আসেন শান্তি রানী বিশ্বাস। তার চোখেমুখে আতঙ্ক আর কৌতুহলের ছাপ। তিনি বলেন, রাতে খবরে দেখেছি, কি ভয়াবহ দুর্ঘটনা! তাই দেখতে এলাম।
কেবল উৎসুক লোকজনই নয়, সড়কের চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকদেরও গাড়ি থামিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়াতে দেখা যায়।
কাটাখালি হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, রাতেই ওই স্থান থেকে দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন দুটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আর পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরাদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আরটিভি/এমএ




