নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জয়রামপুর গ্রামে শত বছরের পুরোনো বটগাছের নিচে বুধবার (১৫ এপ্রিল) থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বউ মেলা।
স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শত বছর ধরে সোনারগাঁও পৌরসভার জয়রামপুর গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছের নিচে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বউঝিরা জড়ো হন। গৃহবধূরা এ মেলায় অংশ নেন বলে এ মেলাকে বউ মেলা নাম দেওয়া হয়েছে।
স্বামীর ‘সোহাগিণী’ বউ হতেই হিন্দু নারীরা ছুটে আসেন এ পূজায়। এ দিনে ঝুড়ি ভরা বৈশাখী ফলের ভোগের সঙ্গে কবুতর ওড়ানো হয় গাছ দেবতার উদ্দেশ্যে। তবে বউ মেলায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই নারী।
বুধবার দুপুরে মেলায় গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় বিভিন্ন গ্রাম থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা ঝুড়িতে দেশীয় বিভিন্ন মৌসুমি ফল, কবুতর ও দেবীর নামে উৎসর্গ করার জন্য পাঁঠা নিয়ে বটগাছের নিচে জড়ো হয়ে পূজা অর্চনা করছেন। এ গাছটি সিদ্ধেশ্বরী কালীতলা নামে পরিচিত। কিন্তু এলাকায় এটাকে বলা হয় বউতলা। অসংখ্য নারীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠা এই মেলার নাম বউ মেলা। পুরুষরাও যান তবে সংখ্যায় কম। প্রতি বছরের মতো এবারও সিদ্ধেশ্বরী কালীতলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজার আয়োজন করেছে। নারীরা মৌসুমী ফল নিয়ে লাইন ধরে বটগাছ তলে ভোগ দিচ্ছেন। মৌসুমী ফলের স্তুপ জমে উঠেছে বটবৃক্ষ গাছতলায়। সেই স্তূপ করা ফল পূজা অর্চনা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। স্বামী-সংসারের বাঁধন যেন আমৃত্যু অটুট থাকে সেই কামনাতেই পূজার আয়োজন। পূজার পরপরই শুরু হয় তিন দিনব্যাপী বউ মেলা। আর এ বউ মেলার কারণে বটগাছটি হয়ে উঠেছে দেবতা।
বউ মেলায় পূজা দিতে আসা স্মৃতি অর্পূনা দাস বলেন, জন্মেও পর থেকে দেখছি আমার মা ও মাসিরা এ বৃক্ষকে পূজা দেন। আমার বিয়ের পর থেকে আমিও এখানে পূজা দিয়ে আসছি। আমরা সিদ্ধেশ্বরী কালী দেবী হিসেবে এ বৃক্ষকে পূজা দেই। প্রথা অনুযায়ী মাটি নিয়ে এ বৃক্ষের গোড়ায় বিভিন্ন বয়সী নারীরা মাটি দিয়ে থাকেন। মাটির সঙ্গে একটি করে কড়ি দিতে হয়। এতে মনোবাঞ্ছনা পূর্ণ হয়। তাছাড়া পরিবারের সদস্য যতজন ততবার মাটি দিতে হয়।
পূজায় আসা দেবী দাস বলেন, পরিবারের সবার জন্য মঙ্গল কামনা করেছি। বিশেষ করে স্বামীর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছি। এবার আমি প্রথম এসেছি ও ভালো লাগছে।
গীতা রানি দাস বলেন, আমি প্রথমবার এ মেলায় এসে পূজা দিয়েছি। স্বামী ও সন্তানের মঙ্গল কামনা করেছি ও পরিবারের জন্য মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বটগাছের গোড়ায় বিভিন্ন বসয়ী নারীরা মাটি দিচ্ছেন। আবার কেউ দুধ ঢেলে দিচ্ছেন। নানা রকমের ফলও দিচ্ছেন কেউ। ঢাকের তালে বৃক্ষতলে পূজায় মগ্ন নারীরা। এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে বাঁশি, কাঠের হাতি, ঘোড়া ও মৃৎশিল্পসামগ্রী, চেয়ার, পিঁড়ি, জলচৌকি ও ঐতিহ্যবাহী খই, উড়খা, কদমা, পেঁয়াজু, নিমকি, জিলাপিসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসেছে। বউ মেলা নারীদের হলেও এখানে পুরুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
সিদ্ধেশ্বরী বটতলায় কালী পূজার আয়োজক নিলোৎপল রায় আরটিভিকে বলেন, প্রায় শত বছরের অধিক সময়ধরে সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের পূজা করা হয়। অত্র এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সার্বজনীনভাবে এ মেলার আয়োজন করেন। এ পূজায় দেশবাসী ও এলাকার মানুষের শান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করা হয়।
সিদ্ধেশ্বরী বটতলায় কালী পূজার পুরোহিত পণ্ডিত উৎপল ভট্টচার্য বলেন, সনাতনী বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে আজকে পহেলা বৈশাখ। সে অনুসারে সনাতন ধর্মালম্বীর বউ-ঝিরা এ মেলায় আসেন। পূজা অর্চনার মাধ্যমে পরিবার ও স্বামীর মঙ্গল কামনা করেন। এ বটতলায় মা সিদ্ধেশ্বরী নামে পূজা করা হয়।
আরটিভি/এমএইচজে




