ইটভাঙা শ্রমে বদলে গেছে নারীর জীবন

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ , ০৮:৩২ পিএম


ইটভাঙা শ্রমে বদলে গেছে নারীর জীবন
ছবি: সংগৃহীত

ইট ভাঙা হচ্ছে রাস্তার পাশে। ইট ভাঙা হচ্ছে বাড়ি আঙিনায় বসে। কোথাও আবার ঘরের বারান্দা কিংবা রান্নাঘরের ভেতরেই চলছে ইট ভাঙার কাজ। বিভিন্ন বয়সী নারীরা ইট ভাঙার কাজ করছেন। কোনো স্থানে একা একা, কোনো স্থানে আবার দলবদ্ধভাবে। 

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরশহরের বালুয়াপাড়া গ্রামে গেলে প্রতিদিনই এই দৃশ্য চোখে পড়বে। সংসারের সব কাজ করার পাশাপাশি ইট ভেঙে পরিবারের অভাব দূর করেছেন এই গ্রামের দেড় শতাধিক নারী। নিজেরা উপার্জনক্ষম হয়ে বদলে দিয়েছেন নিজেদের জীবন যাত্রা। কিন্তু এ গ্রামের নারীরা পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু আজ তারা আত্মনিভর্রশীল। কীভাবে হলো? কোন যাদুবলে সম্ভব হলো তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা?

মূলত কোন যাদুবল নয়। এর পেছনের মূল নিয়ামক দুই বোন। একজন রাবেয়া খাতুন (৩৬), অন্যজন তার বোন আম্বিয়া খাতুন (৩৪)। উভয়েই জীবন বদলে দেয়ার সাহসী যোদ্ধা। তাদের হাত ধরেই বদলে গেছে বালুয়াপাড়া গ্রামের দারিদ্রপীড়িত নারীদের জীবন। 

কিছুদিন আগে বালুয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় ইট ভাঙার কাজ করা নারীদের সাথে। কথা বলে জানা যায় তাদের জীবন-সংগ্রামের গল্প। এক সময় আর্থ-সমাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত নারীরা কীভাবে আত্মনিভর্রশীল হয়ে উঠেছেন এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে বেরিয়ে আসে দিন বদলের নানা কথা। জানা যায় বালুয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুছ সোবহানের মেয়ে রাবেয়া খাতুন ও তার বোন আম্বিয়া খাতুনের সহায়তার কথা। তাদের হাত ধরেই এখানে শুরু হয়েছিলো একটি দিন বদলের গল্প। 

দুই বোনের সাথে কথা বলার পর তারা জানালেন, আনুমানিক ২০ বছর আগের কথা। তখন তারা কিশোরী। বাবা রিকশা চালাতেন। সারা দিন খেটে যা রোজগার করতেন তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণ পোষণ হতো না। কিছু একটা করে সংসারের অভাব দূর করার তাড়নায় একদিন তারা ঘর থেকে বের হন। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ছিলো উপজেলার রামগোপালপুরের পরিত্যক্ত জমিাদার বাড়ি। সেই বাড়ির খসে পড়া ইট কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন তারা। বেশ কিছু ইট ভেঙে সুড়কি করে ময়মনসিংহে শম্ভুগঞ্জ এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন। হাতে কিছু টাকা আসে। এভাবে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি থেকে কিছু দিন ইট কুড়িয়ে এনে জমিয়ে মাঝে মাঝে বিক্রি করেন ফেরিওয়ালার কাছে। সাথে বিক্রি করার মত আরও যা কিছু পায় তাই কুড়িয়ে আনেন তারা। রাবেয়া আর আম্বিয়ার দেখাদেখি অভাবি আরও কিছু কিশোরী জুটে যায় দলে। মাঝে মাঝে মায়েরাও যায় মেয়েদের সাথে। এভাবে চলে পাঁচ বছর। এরমধ্যে বাড়ির কাছের ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশে গড়ে উঠে কয়েকটি ইটভাটা। বালুয়া পাড়ার নারীরা ইটভাটার কাজে জড়িয়ে পড়ে। ইটভাটার ভাঙার অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে একদিন জমানো কিছু টাকা দিয়ে বাড়িতে ইট কিনে আনেন আম্বিয়া ও রাবেয়া। সেই ইট বাড়িতে বসে সুড়কি করে বিক্রি করেন। এতে হাতে টাকা আসে। এরপর শুরু হয় নতুন গল্প। দুই বোন আর মা ইটভাটা থেকে ইট কিনে এনে সুড়কি করে বিক্রি করেন। হাতে টাকা আসতে থাকে। দেখাদেখি বালুয়াপাড়ার অভাবি অন্য পরিবারগুলোও ইট ভেঙে সড়–কি করার কাজ শুরু করেন। ২০ বছর পর এখন ওই এলাকার প্রায় দেড় শতাধিক নারী দিনে ছয় থেকে আট ঘন্টা ইটা ভাঙার কাজ করেন। বদলে গেছে অভাবী মানুষদের জীবন। 

আরও পড়ুন

বর্তমানে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা ও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপনা নির্মাণের জন্য বেশির ভাগ সুড়কির চাহিদা এখান থেকে মিটানো হয়। 

সরেজমিনে দেখা যায় ইট ভাঙার কাজ করা নারীদের অনেকরই এখন আধা-পাকা বাড়ি রয়েছে। 

আম্বিয়া খাতুন বলেন, এই ব্যবসা শুরু করার পর অভাবের সংসারে উন্নতি হয়েছে। স্বামী-সন্তান সহ সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে আমরা এখন সুখি। আমার কারখানায় ১৫ থেকে ১৬ জন নারী ইট ভাঙার কাজ করেন। নারীদের সাথে আমি নিজেও এখনো ইট ভাঙ্গি। পাশাপাশি ব্যবসার আয়ের টাকা দিয়ে অন্যান্য ব্যবসা শুরু করেছি।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বালুয়াপাড়ার ২০টির বেশি পরিবার সরাসারি ইট কিনে সুড়কি করার ব্যবসার কাজে যুক্ত। ইট কিনে আনা ও সুড়কি করে বিক্রির জন্য অনেকেই কিনে নিয়েছেন ট্রলি। যে পরিবারগুলো এখনো নিজেরা ব্যবসার সাথে যুক্ত হতে পারছে না তারা অন্যের অধীনে ইট ভাঙার কাজ করছে। ইট ভাঙার কাজের জন্য তাদের ধরাবাঁধা কোন সময় মানতে হয় না। সংসারের অন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে দিনে-রাতে যখন ইচ্ছা তখন ইট ভাঙে। ইট ভেঙে এক টিন (সয়াবিন তেলের টিন) সুড়কি করলে পায় পাঁচ টাকা। বালুয়াপাড়া গ্রামের নারী পুরুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরুষেরা ইজিবাইক চালানো, মুদি দোকান করাসহ নানা পেশায় আছেন। সাথে পুরুষদের রোজগারের পাশাপাশি নারীদের ইট ভাঙা কাজের রোজগার এখন জীবন যাত্রার মান বদলে দিয়েছে। ছেলে মেয়েরা এখন স্কুলে যায়। 

গ্রামের বাসিন্দা বিধবা হাজেরা বেগম (৪৫) বলেন, আমার পরিবারের লোকজন বাইরে থাকে। অবসরে আমি এখানে এসে ৮ থেকে ১০ টিন ইট ভাঙি। এতে আমার ৫০ টাকার মতো আয় হয়।

তাজ্জতুনন্নেছা বলেন, ২০ বছর ইট ভাইঙা সংসারের খাওন যোগাইছি। এখনও সময় পেলে ভাঙি। ইট ভাঙনের কাজ আমাদের অভাব দূর করছে। যেই এলাকার মানুষ তিন বেলা খাইতে পারতো না, হেরা অহন অনেক সুখে দিন কাটায়।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission