স্ত্রীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিলেন স্বামী

আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ , ০৯:১৪ পিএম


স্ত্রীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিলেন স্বামী
ছবি: সংগৃহীত

ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, কখনও কখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়েও প্রমাণ করা যায়, শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন যেন সেই সত্যকেই নতুন করে সামনে আনলেন। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী মিনারা বেগমের জীবন সংকটে নিজের একটি কিডনি দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন মানবিকতা ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এমন মানবিক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শরীয়তপুর জুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই এটিকে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের বিরল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বছর আগে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর জানা যায়- তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। পাশাপাশি পেটের ভেতরে একটি টিউমারও ধরা পড়ে। পরিবারটির ওপর যেন নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। পরবর্তীতে মিনারাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুদিন চিকিৎসার পরে টিউমারের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। কিন্তু টাকার অভাবে কিডনি স্থাপন করাতে পারেননি স্বামী জসিম উদ্দীন। ধীরে ধীরে মিনারা বেগমের অসুস্থতা বাড়লে শুরু হয় কিডনি ডোনার খোঁজার দীর্ঘ চেষ্টা। একপর্যায়ে মিনারা বেগমের মা কিডনি দিতে রাজি হন কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতায় পরীক্ষা–নিরীক্ষার পরে হার্টের রোগ ধরা পড়ে মিনারা বেগমের মায়ের। এমন অবস্থায় দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েন পরিবারের একমাত্র উপার্জনের ব্যক্তি জসিম উদ্দীন। ঠিক সেই সময় স্ত্রীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যান স্বামী মো. জসিম উদ্দিন (৩৬)। একমুহূর্ত দেরি না করে নিজের একটি কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলী সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে তার কিডনি মিনারার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মিনারা বেগম। বর্তমানে স্বামী ও ছেলে সন্তান নিয়ে ঢাকা শ্যামলী ভাড়া বাসায় থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় দিন গুনছেন তিনি।

পারিবারিক সূত্রে আরও জানা গেছে, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ও মিনারা বেগমের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ২০০৭ সালে। দাম্পত্য জীবনের এক বছর ছয় মাস পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান তামিম আল মারুফ। বর্তমানে সে ঢাকায় নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরেই জসিম উদ্দিন ঢাকায় বসবাস করছেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়েই চলছিল তাদের সুখের সংসার। তবে ২০২৪ সালের শুরুতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মিনারা বেগম। তখনই ধরা পড়ে তার জটিল কিডনি রোগ। এরপর থেকে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কিডনির সমস্যায় মিনারা বেগমের অবস্থা আরোও গুরুতর হতে থাকে। জীবনের কঠিন মুহূর্তে এসে স্বামীর এই আত্মত্যাগ শুধু একটি জীবনই বাঁচায়নি, নতুন করে প্রমাণ করেছে, সত্যিকারের ভালোবাসা এখনও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে।

আরও পড়ুন

মুঠোফোনে মিনারা বেগম বলেন, আমার কিডনির সমস্যার কথা জানার পর থেকেই আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। স্বামীর অল্প আয়ের একটি চাকরি, তার মধ্যে ছেলের পড়াশোনা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল কীভাবে এই কঠিন সময় পার করব। তখন আমার মা তার একটি কিডনি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক পরীক্ষা করার পর তার হার্টের সমস্যার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। ঠিক সেই সময় আমার স্বামী এগিয়ে এসে বললেন, আমরা যদি বাঁচি, একসঙ্গেই বাঁচব, আর যদি মরতে হয়, তাও একসঙ্গেই মরব। আমি অনেকবার তাকে বারণ করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দেওয়া একটি কিডনি আমার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। আল্লাহর রহমতে এখন আমরা দুজনেই ভালো আছি। সত্যি বলতে, আমার মতো ভাগ্যবতী মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না। আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন।

অপরদিকে স্বামী মো. জসিম উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, স্ত্রীর এমন কঠিন অসুস্থতার সময় কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তখন শুধু একটা সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম বাঁচলে দুজনেই বাঁচব, আর মরলেও দুজনেই একসঙ্গে মরব। চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে আমি নিজের ইচ্ছাতেই একটি কিডনি দিয়েছি। স্ত্রীকে নিজের কিডনি দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমার স্ত্রী কখনোই আমাকে বলেনি তোমার কিডনি আমাকে দাও। এটা সম্পূর্ণ আমার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল।

কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দিয়ে জসিম উদ্দিন সত্যিই একটি অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এটি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের অসাধারণ উদাহরণ। আমি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই দম্পতিকে সুস্থ ও ভালো রাখেন।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission