চাঁদপুরে জনবল-ওষুধ-বিদ্যুৎহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য

স্টাফ রিপোর্টার, চাঁদপুর, আরটিভি নিউজ 

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ০১:০৬ পিএম


চাঁদপুরে জনবল-ওষুধ-বিদ্যুৎহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য
ভেঙ্গে পড়ে আছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সদর দরজা : ছবি আরটিভি

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের লাউতলী গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা হলেও বর্তমানে তা নামেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। স্থানীয় জনগণ এখান থেকে তেমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তিন বছর ধরে কেন্দ্রটিতে নেই জনবল, ওষুধ ও বিদ্যুৎ-সংযোগ। এই সুযোগে চুরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আসবাব। রাতের আঁধারে পরিত্যক্ত ভবনটিতে জমে ওঠে মাদকসেবীদের আড্ডা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত স্থানীয় দরিদ্র মানুষ, বাড়ছে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি।

প্রান্তিক পর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় ২০০৫ সালে এ স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি চালু হয়েছিল। প্রথম দিকে এলাকার দরিদ্র মানুষের মুখে ফুটেছিল হাসি। নিজ এলাকায় মিলবে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা। কিছুদিন তারা সেই সেবাও পেয়েছিলেন।

কিন্তু গত প্রায় তিন বছর ধরে ওষুধ ও জনবল সংকটে বন্ধ রয়েছে নরমাল ডেলিভারি, প্রসূতি সেবা, কিশোর–কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ চিকিৎসাসেবা। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চিকিৎসায় ভরসা করতে হচ্ছে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ কেন্দ্রে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন পিয়নের পদ থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো জনবল নেই। জনবল সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় দরজা ভেঙ্গে চুরি হয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা, পানির মোটরসহ গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র। ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে শৌচাগার। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি যেন নিজেই অসুস্থ হয়ে ধুঁকছে। সন্ধ্যার পর পরিত্যক্ত ভবনটি নিয়মিত মাদকের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ আর আক্ষেপের যেন শেষ নেই।

আরও পড়ুন

স্থানীয় বাসিন্দা বশির উল্যা মিজি নামের এক বৃদ্ধ বলেন, আমাদের অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানে ডাক্তার–ঔষধ কিছুই নেই। সেবা না পেয়ে সাধারণ মানুষ দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ডাক্তার ও ওষুধ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

সেবাপ্রার্থী ফিরোজা বেগম (৬০), আমিন উল্যাহ (৫৫), সিরাজুল ইসলাম (৫৭)সহ আরও কয়েকজন জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগ। দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন। এ হাসপাতালে ডাক্তার, ওষুধ কিছুই নেই। জরুরি চিকিৎসার জন্য ভাঙাচোরা সড়ক পেরিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে উপজেলা হাসপাতালে যেতে হয়। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।

আজগর আলী (৭০) নামের এক বৃদ্ধ বলেন, আমরা উপজেলা থেকে দূরে গ্রামগঞ্জের মানুষ হওয়াই যেন বড় পাপ করে ফেলেছি। রাষ্ট্রের নাগরিক সেবার অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। আমাদের ইউনিয়ন পরিবারিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র খাতাকলমে আছে, কিন্তু সেবার ক্ষেত্রে শূন্য। এটি এখন চুরি ও মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। 

হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ, সেবা দেবে কে? বলে প্রশ্ন তোলেন বৃদ্ধ আজগর।

স্থানীয় ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো. মেহেদী হাসান বলেন, এ কেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। জনবল ও ওষুধ সংকট রয়েছে। এগুলো দিলে কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

ফরিদগঞ্জ থানার উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন বলেন, হাসপাতালটিতে চুরির ঘটনায় পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। চোরচক্র ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ। স্থানীয় মাদকসেবী ও চোরচক্র ইতোমধ্যে অনেক কিছু লুট করেছে। চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে সাধারণ মানুষ ও মা–শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত এই কেন্দ্র সচল করা প্রয়োজন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, লাউতলী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিস্থিতি শুনে খারাপ লেগেছে। এসব দেখাশোনা করে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার বিভাগের এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করব। 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও বলেন তিনি।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission