জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে যমুনা নদীর ভাঙনে জেগে ওঠা টিনেরচরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় পতিত বালুময় জমিতে আগাম জাতের উচ্চফলনশীল ভুট্টা চাষে এক ধরনের বিপ্লব ঘটেছে।
জলবায়ু সহিষ্ণু উচ্চফলনশীল আগাম জাতের ভুট্টা চাষে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। ‘যুবরাজ’ জাতের এই ভুট্টা চাষে দ্বিগুণ ফলনের আশা করছেন তারা।
আগাম জাতের ভুট্টা চাষ হওয়ায় বন্যায় ফসল ডুবে যাওয়ার শঙ্কা থেকে মুক্ত রয়েছেন টিনেরচরের সাড়ে ৪০০ কৃষক। সরকারিভাবে উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করা গেলে পুরো অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটবে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, জিও ও এনজিওদের সমন্বয়ে কৃষি উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে।
জানা গেছে, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার যমুনা নদীর ভাঙনে ছোট হয়ে আসছে চুকাইবাড়ী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নটি ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। তবে ভাঙনের মধ্যেই নতুন করে জেগে উঠেছে ‘টিনেরচর’ নামে একটি চর।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও জীবনমান উন্নয়নে যমুনার জেগে ওঠা টিনেরচরের পতিত জমিতে কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কাজ শুরু করেছে ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি।
এই কর্মসূচির ‘অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক’-এর মাধ্যমে কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল ফসল চাষ, উন্নত ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ব্যবহার, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে সহজেই পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হচ্ছেন টিনেরচরের কৃষকরা।
জানা গেছে, চুকাইবাড়ী ইউনিয়নের টিনেরচরের পতিত বালুময় জমিতে চলতি মৌসুমে প্রায় ৭৫০ বিঘা জমিতে আগাম উচ্চফলনশীল ভুট্টার চাষ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কৃষকরা ফলন ঘরে তোলার কাজ শুরু করেছেন।
ব্র্যাকের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশকের ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় কমছে। ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির আওতায় ‘অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক’-এর মাধ্যমে এই চরের ৪২০ জন কৃষককে জলবায়ু সহিষ্ণু আগাম জাতের উচ্চফলনশীল ভুট্টার বীজ প্রদান করা হয়েছে।
পাশাপাশি কৃষকদের ভুট্টা চাষে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ব্র্যাকের এই সহায়তায় কম খরচে ভুট্টা চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এতে বাম্পার ফলন হচ্ছে। আগে যেখানে বিঘাপ্রতি ভুট্টার ফলন ছিল ২৫ থেকে ৩০ মণ, সেখানে এখন উচ্চফলনশীল আগাম জাতের ভুট্টা চাষে ফলন হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ মণ পর্যন্ত।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে চাঙা হবে কৃষি অর্থনীতি। ফলে যমুনার তীরবর্তী টিনেরচরে কৃষি উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এখানকার কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে স্থানীয় জাতের ভুট্টা চাষে ফলন কম হতো। কিন্তু ব্র্যাকের সরবরাহকৃত ‘যুবরাজ’ জাতের ভুট্টায় ফলন দ্বিগুণ হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আগে ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল চাষে বন্যার আতঙ্ক থাকত, কিন্তু আগাম জাতের কারণে এখন বন্যার আগেই ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে। এতে তারা লাভবান হচ্ছেন। তারা আরও বলেন, এই কর্মসূচি সব এলাকায় ছড়িয়ে দিলে কৃষিতে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটবে।
ব্র্যাকের ‘অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক’ সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির আওতায় টিনেরচরের কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ সহিষ্ণু ভুট্টা চাষের জন্য আগাম ও উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষকদের সহায়তা করা হচ্ছে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রতন মিয়া বলেন, দেওয়ানগঞ্জ একটি নদীভাঙন কবলিত এলাকা। এখানে উপজেলা কৃষি অফিস ও বিভিন্ন এনজিওর সমন্বয়ে জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আগাম জাতের ভুট্টার বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই বীজ ব্যবহারের ফলে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষা পাবে। আমরা জিও-এনজিও মিলে কৃষির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।
আরটিভি/এমএইচজে




